!! ফলো-আপ !! গণপূর্তের ‘স্বর্ণখনি’ ঢাকা বিভাগ–৪: ফ্যাসিবাদী আমলে অবৈধ অর্থ সংগ্রহের নীরব কারখানা ?

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : গত জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রের অবৈধ অর্থ সংগ্রহের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে পরিচিত ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। বিশেষ করে যেসব বিভাগে প্রকল্পের পরিমাণ ও বাজেট তুলনামূলক বেশি, সেগুলোকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ, কমিশন ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রশাসনের অলিন্দে।


বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—এই ‘সংবেদনশীল ও লাভজনক’ বিভাগ গুলোর শীর্ষে ছিল ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪। সংশ্লিষ্ট সূত্র গুলোর দাবি, এখানে সাধারণত ক্ষমতাসীনদের আস্থাভাজন ও রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত প্রকৌশলীদেরই পদায়ন দেওয়া হতো।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এই বিভাগ থেকে নিয়মিত সুবিধা নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

মাসুদ রানার উত্থান: আস্থাভাজন থেকে ‘কী ম্যান’ :  সূত্র জানায়, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ–৩-এ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. মাসুদ রানা সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামীপন্থী মহলের আস্থাভাজনে পরিণত হন। সেই ধারাবাহিকতায়ই তাকে পরে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।


বিজ্ঞাপন

দরপত্রে কৌশল বদল, ঠিকাদার বাছাই৷ ?  ২০২২–২৩ ও ২০২৩–২৪ অর্থবছরে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ–৩-এ দায়িত্ব পালনকালে এপিপি প্রকল্পের কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারদের হাতে যায় বলে অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, ছাত্রজীবন থেকেই মো. মাসুদ রানা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

মামলার তালিকা থেকে নাম ‘বাদ’—রহস্য কোথায় ?  ছাত্র ও জনতার ওপর হামলা ও গণহত্যা সংক্রান্ত একটি মামলায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারসহ ১৫ জন কর্মকর্তা আসামি হলেও রহস্যজনকভাবে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার নাম বাদ পড়ে যায়। বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক ও আইনগত মহলে।

মীমাংসার তদবির ও অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, মামলাটি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বাদীর সঙ্গে দেন-দরবার চালাচ্ছেন প্রধান প্রকৌশলী ও তার ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা। মামলা মীমাংসার জন্য বিপুল অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের (বর্তমানে ডিমোশনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী) আস্থাভাজনদের ওপর। সেই তালিকায় নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানাও ছিলেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।

নভেম্বর ২০২৪: অফিস আদেশ উপেক্ষা করে দরপত্র ?
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর এপিপির একাধিক কাজ এলটিএমের পরিবর্তে এনসিটি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়।

অথচ প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে আগেই অফিস আদেশ জারি করে নির্দিষ্ট ই-জিপি আইডি নম্বরের (১০৩৫৯১০, ১০৩৫৯৩৩, ১০৩৫৯৮৯, ১০৩৬১২৯, ১০৩৬১৪৬, ১০৩৬৪১৫, ১০৩৬৯৫৮ ও ১০৩৭১৩৪) দরপত্র সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

এই প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই পূর্ত ভবন ও মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে ১০৩৫৯১০ ও ১০৩৬১২৯ আইডির কাজ ছিল ফার্নিচার সরবরাহ।

অথচ গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিজস্ব গণপূর্ত কারখানা বিভাগ থাকা সত্ত্বেও কেন এসব সরবরাহের দরপত্র গণপূর্ত বিভাগ–৪ থেকে আহ্বান করা হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত অর্থ সংগ্রহই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

হাসপাতাল প্রকল্পে ‘নামমাত্র কাজ’, কোটি টাকার হিসাব ? হাসপাতালের বিশেষ বরাদ্দের একাধিক কাজ ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দের ঠিকাদারদের দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

নামমাত্র কাজ দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে।

২০২৫–২৬ অর্থবছরেও একই চিত্র ? চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এপিপি বরাদ্দের পাঁচটি কাজ এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এসব কাজ থেকেও মোটা অঙ্কের কমিশন লেনদেন হয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে।

যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ : এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

প্রশ্নগুলো থেকেই যায় : অফিস আদেশ উপেক্ষা করে দরপত্র পদ্ধতি বদলের নেপথ্যে কারা ? নিজস্ব কারখানা থাকা সত্ত্বেও ফার্নিচার সরবরাহে বাইরের দরপত্র কেন ? মামলা থেকে নাম বাদ পড়া কি কাকতালীয়, নাকি প্রভাবের ফল ? গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই ‘স্বর্ণখনি’ বিভাগগুলোতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

👁️ 28 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *