
মীর্জা সুমন (ফ্রান্স থেকে) : রাজনীতির ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যা শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়—বরং একটি সময়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, যাদের একসময় রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা হয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল, আজ তারাই আবার জনসমর্থনের ভিত্তিতে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসছেন। এই পরিবর্তন অনেকের কাছে শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং সময়ের নির্মম কিন্তু শিক্ষণীয় বাস্তবতা।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি অনেকে ব্যাখ্যা করছেন। পবিত্র কুরআন -এ বলা হয়েছে: “তারা পরিকল্পনা করে, আর আল্লাহও পরিকল্পনা করেন। আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।”—এই আয়াত উদ্ধৃত করে অনেকেই বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে ভাগ্যের পরিহাস ও ন্যায়ের প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাবরের প্রত্যাবর্তন আলোচনায় : চারদলীয় জোট সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বাবরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জঙ্গিবাদ দমন এবং রাজনৈতিক সংঘাত—সব মিলিয়ে সেই সময়কাল ছিল তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ। পরবর্তীতে নানা মামলায় দীর্ঘ কারাবাসের পর তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়েন।

তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে তার নাম আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে যখন দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান এর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং দলীয় পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন বাবরের মতো নেতাদের ত্যাগ ও দীর্ঘ কারাবাসের বিষয়টি সমর্থকদের মধ্যে আবেগের জন্ম দিচ্ছে।

ত্যাগ, প্রত্যাশা ও জনমতের রাজনীতি : সমর্থকদের একটি অংশ মনে করেন, যারা কঠিন সময়ে দলের পাশে থেকেছেন এবং দীর্ঘ কারাবরণ করেছেন, তাদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেখা গেলে তা প্রতীকী অর্থ বহন করত।
বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো সংবেদনশীল পদে এমন একজনের উপস্থিতি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানের বার্তা দিত—এমন মতও শোনা যাচ্ছে।
অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ত্যাগের পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতা, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং মানবাধিকার ইস্যু বিবেচনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও জাতীয় স্বার্থ : বাংলাদেশের রাজনীতি বরাবরই আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ -এর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রায়ই ইন্ডিয়া -সহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের আলোচনায় উঠে আসে।
ফলে স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়—এটি কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে।
এই বাস্তবতায় যেকোনো নিয়োগ বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে শুধু আবেগ নয়, কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিতেও মূল্যায়ন করতে হয়।
উপসংহার : রাজনীতির মঞ্চে চূড়ান্ত বিজয় বা পরাজয় স্থায়ী নয়—স্থায়ী হলো জনসমর্থন ও সময়ের বিচার। যাদের একসময় রাজনৈতিকভাবে নিঃশেষ করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তারাই আবার সংসদের আসনে—এটি ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত এক চিত্র।
বাবরের প্রসঙ্গ তাই শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত যাত্রা নয় ; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ওঠানামা, ত্যাগ, বিতর্ক এবং পুনরুত্থানের এক প্রতীকী অধ্যায়। এখন দেখার বিষয়—এই প্রত্যাবর্তন কতটা গঠনমূলক রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপ নেয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী বার্তা রেখে যায়।
