
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কয়েকজন পরিচিত মুখকে ঘিরে যে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে, তা মূলত ক্ষমতার পালাবদল এবং রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই। বিশেষ করে চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী-কে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়; তবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তাঁর অবস্থান ও বক্তব্য ঘিরে আলোচনার মাত্রা বেড়েছে।


ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি শিল্পী ? সমালোচকদের একটি অংশের অভিযোগ—যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, কিছু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সবসময় ক্ষমতার বলয়ে জায়গা করে নেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ফারুকীর বিভিন্ন বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে ইতিবাচক অবস্থান দেখা গেছে—এমন পর্যবেক্ষণ অনেকের।


পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সংস্কৃতি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন—এটি কি শুধুই যোগ্যতার স্বীকৃতি, নাকি রাজনৈতিক নৈকট্যের ফল? যদিও সরকারিভাবে তাঁর নিয়োগ ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অংশ, রাজনৈতিক মহলে এটিকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা ছড়ায়।

নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থান বদল ? জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) উল্লেখযোগ্য আসনে জয়ী হওয়ার পর ফারুকীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে তারেক রহমান-এর প্রতি ইতিবাচক মন্তব্য উঠে আসে। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি নাকি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান-এর পথ অনুসরণ করছেন।

এখানেই সমালোচকদের কটাক্ষ—“রাজনীতি বদলায়, শিল্পীর ভাষ্যও বদলায়।” প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি আদর্শগত পরিবর্তন, নাকি ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার কৌশল?
অভিনেত্রীদের প্রসঙ্গ: বৈষম্যের অভিযোগ : বিতর্কের আরেকটি অংশ জড়িত দুই অভিনেত্রীকে ঘিরে। নুসরাত ফারিয়া বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকে শেখ হাসিনার চরিত্রে অভিনয় করার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গ্রেফতার হন—এমন খবর গণমাধ্যমে আসে। অন্যদিকে নুসরাত ইমরোজ তিশা, যিনি একই ধারার ঐতিহাসিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং ফারুকীর সহধর্মিণী, তাঁকে ঘিরে তেমন প্রশাসনিক পদক্ষেপের খবর পাওয়া যায়নি।

এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—আইনের প্রয়োগ কি সমানভাবে হয়েছে ? নাকি ব্যক্তি-সম্পর্ক ও প্রভাব এখানে ভূমিকা রেখেছে? যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি।
“ফ্যাসিবাদী চক্র” নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতা ? সমালোচকরা আওয়ামী লীগকে “ফ্যাসিবাদী চক্র” হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন—বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিজীবী বলয় থাকা নতুন কিছু নয়; এটি প্রায় সব আমলেই দেখা গেছে।

ফারুকীকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক, তা মূলত বৃহত্তর একটি প্রশ্নকে সামনে আনে , শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক অবস্থান কি নীতিগত, নাকি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত?
ব্যঙ্গাত্মক বাস্তবতা : রাজনৈতিক মহলে এখন একটি রসিকতা প্রচলিত— “বাংলাদেশে সরকার বদলায়, পোস্ট বদলায়, স্ট্যাটাস বদলায়—কিন্তু বিতর্ক বদলায় না।” এই ঘটনাপ্রবাহ হয়তো প্রমাণ করে, আমাদের রাজনীতিতে ব্যক্তির চেয়ে প্রভাবশালী হলো ক্ষমতার কেন্দ্র। আর সেই কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরপাক খায় রাজনৈতিক প্রশংসা, সমালোচনা ও সুবিধাবাদের অভিযোগ।

উপসংহার : মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কিংবা সংশ্লিষ্ট অভিনেত্রীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলো কেবল ব্যক্তি নয়—রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়েই বড় বিতর্কের ইঙ্গিত দেয়।
আইনের প্রয়োগে সমতা, : প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের রাজনৈতিক অবস্থানের নৈতিকতা—এই তিনটি প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রাজনীতির মঞ্চে আলো যেমন তীব্র, ছায়াও তেমনি গভীর। সেই ছায়া-আলোর মধ্যেই তৈরি হয় চাঞ্চল্যকর গল্প—আর সেখানেই জন্ম নেয় জনমতের নতুন
