
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল।

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর চকবাজারের মৌলভীবাজারে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল যখন বাজার তদারকির দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির বাধা প্রদান এবং পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা গ্রহণে অনীহার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ঘটনার পটভূমি : মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি প্রকাশ্যে সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়েছেন—এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজেও উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ, ভেজালবিরোধী অভিযান বা লাইসেন্স যাচাই কার্যক্রমের সময় উত্তেজনা তৈরি হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দাবি করেছে, সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় মামলা করতে গেলে সংশ্লিষ্ট থানা তা গ্রহণ করেনি। যদি এ অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর বড় পাইকারি বাজারগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ব্যবসায়ী সমিতি, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের একাংশের মধ্যে একটি “সমঝোতা কাঠামো” কাজ করে—যা অনেক সময় নিয়মিত বাজার তদারকি কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

এই ঘটনার সঙ্গে বিএনপি-সমর্থিত কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন মহলে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়নি, তবুও প্রশ্ন উঠছে— বাজার সিন্ডিকেট কি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পরিচালিত ?
প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কি যথেষ্ট সুরক্ষা পাচ্ছেন ? গণমাধ্যম কর্মীরা যখন এমন ঘটনা প্রকাশ করেন, তখন তাঁদের ওপরও কি চাপ সৃষ্টি হয় ?
গণমাধ্যমের ভূমিকা : ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি জনমনে আলোড়ন তোলে। গণমাধ্যমের কিছু প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তাঁদের কাজেও বাধা দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। যদি তা সত্য হয়, তবে এটি কেবল একজন কর্মকর্তার ওপর নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর আঘাত।
প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বনাম প্রভাবশালী চক্র : বাংলাদেশে বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভেজালবিরোধী অভিযান ও মূল্যতালিকা বাস্তবায়ন নিয়ে বহুবার প্রশাসন ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মধ্যে টানাপোড়েন দেখা গেছে।
প্রশ্ন হলো— আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যদি অভিযোগ গ্রহণেই অনীহা দেখায়, তাহলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন ? এতে কি সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ না হলে এটি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে—যেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রশাসনিক কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করেও পার পেয়ে যেতে পারে।
উপসংহার : চকবাজারের মৌলভীবাজারের এই ঘটনা কেবল একটি বাজারের বিরোধ নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক শক্তির জটিল সমীকরণের প্রতিফলন। সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে বাধা, মামলা গ্রহণে অনীহা, এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক ছায়া—সব মিলিয়ে বিষয়টি একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে।
এখন দেখার বিষয়—রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কত দ্রুত ও কতটা নিরপেক্ষভাবে পদক্ষেপ নেয়। কারণ, আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো ব্যবস্থার ওপর, আর শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ নাগরিকই।
