
আবু নাঈম শরণখোলা, (বাগেরহাট) : সুন্দরবনের দস্যু দমনে কম্বিং অপারেশন চলছে। একদিনের ব্যবধানে কোস্ট গার্ড সদস্যরা সুন্দরবনের দুই দস্যুদলের গুরুত্বপূর্ণ দুই সদস্যকে আটক করেছে। তাদের দেয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও বেশকিছু গুলি উদ্ধার করা হয়েছে বলে কোস্ট গার্ড সূত্র নিশ্চিত করেছে।

কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১২মার্চ) সকাল ৬টার দিকে পূর্ব বনবিভাগের শেলা নদীসংলগ্ন মুর্তির খাল এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে দূধর্ষ বনদস্যু করিম শরীফ বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড ওসমান গনিকে (৩৮) আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুর্তির খাল এলাকার বনে তল্লাশি চালিয়ে ১টি একনলা বন্দুক, ১৬ রাউন্ড তাজা কার্তুজ এবং ৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে শিবসা নদীতে অভিযান চালিয়ে সুন্দরবনের আরেক কুখ্যাত বনদস্যু দয়াল বাহিনী সক্রিয় সদস্য আব্দুল হালিমকে (৩৬) আটক করা হয়। তার কাছ থেকে ১টি একনলা বন্দুক ও ৪ রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (বিএন) সাব্বির আলম সুজন জানান, কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের গোয়েন্দা বিভাগের চৌকস সদস্যরা প্রথমে দস্যুদের অবস্থান শনাক্ত করেন। অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পরে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আটক দস্যুরা সুন্দরবনে ডাকাতির পাশপাশি দীর্ঘদিন ধরে তাদের বাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহকারী হিসেবেও কাজ করে আসছিল।

দীর্ঘদিন দস্যুমুক্ত থাকার পর গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে দস্যুদের দৌরাত্ম বৃদ্ধি পায়। আওয়ামীলীগ সরকারের সময় আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা দস্যুরা নতুন করে দল গঠন করে দস্যুতা শুরু করে। হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা ৫/৬ টি দস্যু বাহিনীর বেপরোয়া তান্ডবে জেলে ও বাওয়ালী দিশেহারা হয়ে পড়ে। দস্যুরা জেলেদের উপর হামলা করে অস্ত্রের মূখে তাদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাদের উপর নির্যাতনের পাশাপাশি মুক্তিপন হিসাবে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয় বলে মৎস্যজীবীরা জানায়।
দস্যুূদের তান্ডবের এক পর্যায় নিরাপত্তাহীনতার কারনে দুবলারচরের শুটকি পল্লীতে মৎস্য আহরনে নিয়োজিত দশ সহস্রাধিক জেলে সাগরে যেতে অনীহা প্রকাশ করে। তাদের মহাজনরা মৎস্য আহরন বন্ধ করে সরকারের কাছে নিরাপত্তার দাবি জানায়। দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল আহম্মেদ সংবাদ সম্মেলন করে জেলেদের নীরাপত্তাহীনতা দাবি করেন।
এ প্রেক্ষিতে নতুন সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রী লায়ন ড. ফরিদুল ইসলাম গত ২২ ফেব্রুয়ারী খুলনা বিভাগীয় এক প্রশাসনিক সভায় সুন্দরবনের দস্যু দমনের জন্য প্রশাসনের প্রতি কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন। এ নির্দেশনার পর সুন্দরবনে কোস্ট গার্ড, নৌ বাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বনবিভাগের সমন্বয়ে কম্বিং অপারেশন শুরু হয়।
এ কম্বিং অপারেশনের মধ্যেও ৫ মার্চ রাতে সুন্দরবনের শৌলা এলাকা থেকে অস্ত্রের মুখে ৩ জেলেকে অপহরণ করেছে বনদস্যু করিম শরীফ বাহিনী। অপহৃত মোঃ রায়হান ও সুমন শরণখোলা উপজেলার খুড়িয়াখালী ও সগীর বয়াতী চালিতাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা। এদের প্রত্যেকের মুক্তিপন হিসাবে ৮০ হাজার টাকা চাঁদা দাবী করা হয়েছে।
শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্র দুবলার চরের বিশেষ টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ফরেস্ট রেঞ্জার) মিল্টন রায় জানান, দুবলার জেলে পল্লীগুলোতে দস্যু আতংক বিরাজ করছে। চাহিদা অনুযায়ী চাঁদা না পাওয়ায় সংঘবদ্ধ দস্যুরা যে কোনো সময় শুঁটকি পল্লীতে হানা দিতে পারে বলে জেলেরা শঙ্কায় ভুগছেন। দস্যু আতংকে মৎস্য আহরন বিঘ্নিত হওয়ায় এবার শুটকি খাতে সরকারি রাজস্ব ঘাটতির আশংকা করেন তিনি।
কোস্ট গার্ডের ঐ মিডিয়া কর্মকর্তা জানান, সুন্দরবন দস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের কম্বিং অপারেশন চলবে।
