“বিসিএস ছাড়াই ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ, আদালতের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা, একই সময়ে দুই প্রতিষ্ঠানের বেতন উত্তোলন — গণপূর্তে জাহাঙ্গীর আলম সিন্ডিকেটের বিস্ফোরক দুর্নীতির অভিযোগ” !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনামলে সরকারি চাকরিতে দলীয়করণ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বহু অভিযোগের মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি নিয়োগ কেলেঙ্কারি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বিসিএস পরীক্ষাকে পাশ কাটিয়ে ছাত্রলীগপন্থী কয়েকজনকে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর সেই বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তদের অন্যতম মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে শত শত কোটি টাকার কাজ নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবশালী নির্বাহী প্রকৌশলী।


বিজ্ঞাপন

সূত্রমতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাধারণত ৯ম গ্রেডে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়া হলেও, আওয়ামীপন্থী একটি সিন্ডিকেট পিএসসিকে ব্যবহার করে মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, সমীরণ মিস্ত্রী, জিয়াউর রহমান, মোঃ আবু তালেবসহ কয়েকজনকে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়া, শেখ সেলিম ও শেখ হেলালের তদবিরে পিএসসিতে বিশেষ সুপারিশ পাঠানো হয়।

আরও ভয়াবহ অভিযোগ হলো—তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাকি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান এটিএম আহমেদুল কে সরাসরি ফোন করে নির্দেশ দেন যেন কোনো লিখিত পরীক্ষা বা প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র ভাইভার মাধ্যমে নির্ধারিত তালিকার ১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে পিএসসি নামমাত্র ভাইভা নিয়ে সেই সুপারিশ চূড়ান্ত করে।


বিজ্ঞাপন

এই অবৈধ নিয়োগের প্রতিবাদ করেন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা। তারা হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে আদালত ১৭টি পদ বিসিএস কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষণের আদেশ দেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, আদালতের সেই আদেশকেও কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়। বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তদের শুধু বহালই রাখা হয়নি, বরং সংরক্ষিত কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে তাদের সিনিয়রিটিও দেওয়া হয়।


বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ হচ্ছে—আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালীন প্রায় ১১ মাস ব্যাকডেট দেখিয়ে যোগদানপত্র তৈরি করা হয় এবং চাকরিতে উপস্থিত না থেকেও সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ বকেয়া বেতন উত্তোলন করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বিআইডাব্লিউটিএতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সেখান থেকে নিয়মিত সরকারি বেতন উত্তোলন করছিলেন। একই সময়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকেও তিনি বেতন গ্রহণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

শুধু জাহাঙ্গীর আলম নন—মোঃ আইয়ুব আলী মেরিন একাডেমিতে, মোঃ নাফিজ আহমেদ রাজশাহীতে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অন্যরা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বেতন নিয়েও পরে ব্যাকডেটে সরকারি চাকরিতে যোগদানের সুবিধা ভোগ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের পেছনে সাবেক সচিব শহীদ উল্লাহ খন্দকার, সাবেক এমপি শেখ সেলিম, শেখ হেলাল এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়ার প্রত্যক্ষ মদদ ছিল।

এদিকে সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের “পি পি ডব্লিউ ডি উড ডিভিশন” ঘিরেও নতুন করে বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। সূত্র দাবি করেছে, প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাঠ ও ফার্নিচার সংক্রান্ত কাজকে কেন্দ্র করে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম প্রভাবশালী এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে বিশেষ ইউনিটে পদায়ন নেন।

গণপূর্ত কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম।

অভিযোগ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিপিপির আওতায় আসা বিপুল অংকের এই প্রকল্পকে দুই ভাগে বিভক্ত করে কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করা হয়। প্রধান প্রকৌশলীর সামনেই সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষ থেকে বড় অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক প্রভাবশালী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।

সূত্র আরও জানিয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর ভাই “মামুন”-এর নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টাও চলছে। আর এই পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম।

অভিযোগ রয়েছে, জাহাঙ্গীর আলম নিয়মিতভাবে হাতিল, পশ ফার্নিচার, রিগেল ফার্নিচার, আকতার ফার্নিচার এবং ডট ফার্নিচারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ বণ্টন করেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে পৃথক তদন্ত চলমান থাকা সত্ত্বেও কীভাবে জাহাঙ্গীর আলম প্রায় দেড়শ কোটি টাকার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অনুমতি পান?

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান বিপ্লব বলেন, “রিপোর্টটি আগেই দেওয়ার কথা ছিল। কেন দেওয়া হয়নি জানি না। তবে আমি আবার চিঠি দেব দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য।”

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—ক্ষমতার ছত্রছায়া ছাড়া কি একজন বিতর্কিত কর্মকর্তা বছরের পর বছর ধরে এত বড় বড় প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন ? নাকি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে এখনও সক্রিয় রয়েছে আওয়ামী আমলের সেই শক্তিশালী দুর্নীতি সিন্ডিকেট?

দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলোর প্রতি এখন জনসাধারণের একটাই প্রত্যাশা—এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

👁️ 133 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *