প্রশাসন-শিক্ষার দুষ্টচক্র: বিপন্ন প্রজন্ম ও আমাদের দায়

Uncategorized ইতিহাস ঐতিহ্য জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী শিক্ষাঙ্গন সারাদেশ

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান  :  একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ পরিমাপের দুটি অনস্বীকার্য নিয়ামক বা ব্যারোমিটার হলো—তার প্রশাসনিক সততা এবং শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের সামষ্টিক পথপরিক্রমা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই দুটি স্তম্ভই আজ এক গভীর কাঠামোগত সংকটে নিমজ্জিত।


বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিককালে গণমাধ্যমে প্রকাশিত দেশের রাজস্ব প্রশাসনের (এনবিআর) একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিপুল অবৈধ সম্পদ ও অর্ধশতাধিক ফ্ল্যাটের খতিয়ান কিংবা বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের নজিরবিহীন ক্ষমতার অপব্যবহার ও অকল্পনীয় বিত্ত-বৈভবের বিবরণ আমাদের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার এক কদর্য রূপকে উন্মুক্ত করেছে।

একই সাথে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়কে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। বিগত বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিপ্রায়ে ২,৩৫৭ জন কর্মকর্তাকে যে বিনাসুদে গাড়ি ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরও ২১৩ জন কর্মকর্তার সেই একই সুবিধা গ্রহণ নৈতিকতার চরম স্খলনকে নির্দেশ করে। (অবশ্য বর্তমান সরকার কর্তৃক এই অন্যায্য ঋণ সুবিধা স্থগিত করার সময়োপযোগী সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য)।


বিজ্ঞাপন

বিগত দেড় দশক ধরে আমলাতন্ত্রকে যেভাবে বৈধ-অবৈধ সুযোগ-সুবিধা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি দিয়ে প্রলুব্ধ করা হয়েছে, তা প্রশাসনের মেরুদণ্ড তথা ‘পেশাদারিত্বের নৈতিক ভিত্তি’ (Professional Ethics) ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।


বিজ্ঞাপন

প্রশাসনের এই মজ্জাগত অবক্ষয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের লক্ষ্যহীন, অবৈজ্ঞানিক এবং দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত শিক্ষাব্যবস্থারই এক অনিবার্য ‘সামাজিক উপজাত’ (Social Byproduct)।

শিক্ষাখাতে মেকি বরাদ্দ এবং নির্বাচনী ইশতেহারের বৈপরীত্যঃ
বর্তমান ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণের পূর্বে অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালোভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা শিক্ষা খাতে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ন্যূনতম ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করবে। কিন্তু ক্ষমতার বাস্তবতায় বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে আমরা সেই চর্বিতচর্বণ ও ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক সুরই শুনতে পাচ্ছি—এবার নাকি বরাদ্দ দেওয়া হবে মাত্র ২ শতাংশ এবং পর্যায়ক্রমে তা ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।

শিক্ষা খাতের এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি ও কাঠামোগত ক্ষত নিরাময়ে এই ২ শতাংশ বরাদ্দ যে কতটা অপ্রতুল এবং অবাস্তব, তা নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। যে খাতটিকে দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে কাঠামোগতভাবে অবহেলা এবং আদর্শিকভাবে ক্রমাগত ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে, সেখানে আমূল সংস্কার বা ‘প্যারাডাইম শিফট’ (Paradigm Shift) আনার জন্য প্রথম বাজেটেই বড় অঙ্কের বরাদ্দ দিয়ে একটি বৈপ্লবিক ও দূরদর্শী বার্তা দেওয়া আবশ্যক। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে যেন ব্যর্থতার পরিচয় না দেয়।

মেরিটোক্রেসির অপমৃত্যু ও ‘দুর্নীতিবান্ধব’ মনস্তত্ত্বের বিকাশঃ
যখন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে মেধা, সততা ও সৃজনশীলতার চেয়ে রাজনৈতিক তোষামোদি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার অধিকতর লাভজনক ও ‘সামাজিক পুঁজি’ (Social Capital) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন স্বভাবিকভাবেই যুবসমাজের সামষ্টিক মনস্তত্ত্ব ও আকাঙ্ক্ষা দিক হারায়। আজ আমাদের স্কুল-কলেজের উদীয়মান তরুণদের একাংশের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশত্যাগ।

এই ব্যাপক মেধা পাচার বা ‘ব্রেন ড্রেন’ (Brain Drain) প্রমাণ করে যে, তরুণ প্রজন্ম এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামোর ওপর আস্থা রাখতে পারছে না।

অন্যদিকে, যারা দেশেই অবস্থান করছে, তাদের একটি বড় অংশের মেধা ও সময় অপচয় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রেখেই কেবল বিসিএস গাইড মুখস্থ করার পেছনে। জ্ঞানার্জন, গবেষণামূলক মনন গঠন কিংবা নিঃস্বার্থ দেশসেবা আজ তাদের লক্ষ্য নয়; বরং বিসিএস ট্যাক্স, পুলিশ বা প্রশাসন ক্যাডারের অংশ হয়ে সেই ‘অসীম ও জবাবদিহিহীন ক্ষমতার’ অংশীদার হওয়াই মূল উদ্দেশ্য। যেখানে ক্ষমতার আড়ালে ঘুষ, দুর্নীতি আর অর্থ পাচারের মাধ্যমে রাতারাতি সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জন করা যায়।

যে তরুণ প্রজন্ম কেবল অনৈতিক উপায়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখে বড় হয়, তারা যে রাষ্ট্রকে এক অনিবার্য ধ্বংসের দিকে ধাবিত করবে—তা অনুধাবনের জন্য সমাজবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এমনকি আমাদের তরুণ রাজনীতিকদের একাংশের অবচেতন মনেও আজ জনসেবার চেয়ে লুণ্ঠন ও অর্থ পাচারের লিপ্সাই প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।

আগামীর বাংলাদেশ: শৈশব থেকে শিক্ষার পুনর্গঠন :  আমরা যদি সত্যিই একটি মেধাভিত্তিক, মানবিক, বৈষম্যহীন এবং সাম্যবাদী ‘সুন্দর বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ করতে চাই, তবে এই পচনশীল ব্যবস্থাটিকে আমূল উপড়ে ফেলে নতুন করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে হবে। এই কাঠামোগত শিক্ষাসংস্কারের সূচনা হতে হবে শৈশব তথা প্রাথমিক শিক্ষা স্তর থেকে।

নাগরিক দায়িত্ব ও সামাজিক সম্পৃক্ততা (Civic Engagement)  :  একটি শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই তত্ত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক নাগরিক আচরণ শেখাতে হবে। চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি সচেতনতা শিক্ষার অংশ হতে হবে। মানুষ যে একটি সামাজিক জীব এবং সমাজের প্রতি তার যে অলিখিত দায়বদ্ধতা (Social Contract) রয়েছে—এই বোধটি শিশুর মনস্তত্ত্বে গেঁথে দিতে হবে।

পরিবেশগত সংবেদনশীলতা ও নৈতিকতার পাঠ :  বন, বন্যপ্রাণী, জলবায়ু ও প্রকৃতির গুরুত্ব কেবল মুখস্থ বিদ্যার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনচর্যার অংশ হিসেবে রূপান্তর করতে হবে। কারখানার কালো ধোঁয়ায় (Industrial Chimneys) ধূসর হওয়া এই ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীতে আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নৈতিক মূল্যবোধ ও ‘সততার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’।

শিক্ষক নিয়োগে গুণগত উৎকর্ষ ও স্বকীয়তা : এই রূপান্তরমূলক শিক্ষা প্রদানের জন্য যে মানের দূরদর্শী শিক্ষকের প্রয়োজন, আমরা কি তা তৈরি করতে পেরেছি? শিক্ষক নিয়োগে যদি মেধার পরিমাপক হিসেবে ‘দলীয় আনুগত্য’ প্রধান বিবেচ্য হয়, শিক্ষকরাই যদি অসৎ ও সুযোগসন্ধানী হয়ে পড়েন, তবে তাদের হাত দিয়ে একটি ক্ষয়িষ্ণু প্রজন্মই তৈরি হবে—যার খেসারত আজ রাষ্ট্র দিচ্ছে।

নীতিনির্ধারকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান  :  বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি এবং সরকারের নীতি-নির্ধারকদের প্রতি অত্যন্ত বিনীত ও যৌক্তিক প্রশ্ন রাখতে চাই: আপনারা কি এই গভীর ও বহুমাত্রিক কাঠামোগত সংকটসমূহ সম্বন্ধে পূর্ণাঙ্গভাবে অবহিত? আপনারা কি এই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান নিয়ে ভাবছেন? যদি সত্যিই ভেবে থাকেন, তবে শিক্ষার এই পুঞ্জীভূত ব্যাধি দূরীকরণে মাত্র ২ শতাংশ বরাদ্দ কীভাবে আপনাদের জাতীয় নীতি বা কৌশল হতে পারে?

কেবল মৌখিক আশ্বাস কিংবা ধীরগতির সংস্কারের সান্ত্বনা দিয়ে এই ঐতিহাসিক সামাজিক ক্ষত নিরাময় অসম্ভব। সরকারকে অতি দ্রুত তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান সদিচ্ছা প্রদর্শন করতে হবে। শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ অবিলম্বে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে হবে। একই সাথে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন (Institutional Autonomy) ফিরিয়ে এনে তা কার্যকর ভাবে মনিটরিং করতে হবে যাতে করে অতীতের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার করতে না পারে।

প্রশাসনিক অবক্ষয় ও শিক্ষার দৈন্যদশার যে নিকৃষ্টতম দুষ্টচক্রে (Vicious Cycle) বাংলাদেশ আজ আবর্তিত হচ্ছে, তা ভাঙার এটাই চূড়ান্ত সময়। শিক্ষায় বিনিয়োগ কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা দালানকোঠা নির্মাণ নয়; এটি একটি প্রজন্মের নৈতিকতা, মননশীলতা ও মেধার টেকসই ভিত্তি স্থাপন।

সরকার যদি এই ঐতিহাসিক গুরুভার উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়, তবে ইতিহাসের নির্মম কাঠগড়ায় তাদেরও পূর্বসূরিদের মতোই জবাবদিহি করতে হবে। আমরা কোনো দূরদর্শিতাহীন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো চাই না; বরং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি’র নেতৃত্বে আমরা একটি মেধাভিত্তিক, আলোকিত, প্রগতিশীল ও মানবিক বাংলাদেশের অভ্যুদয় দেখতে চাই।

(লেখক  :   প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া ও রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক।)

👁️ 50 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *