
বিশেষ প্রতিবেদক : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। সেই আন্দোলনের অন্যতম দাবিই ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতিকে দলীয়করণ, লুটপাট ও প্রভাবমুক্ত করা। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরও দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে নতুন করে দেখা দিয়েছে বিতর্ক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ।

সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ব্যাংকটির গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার ও ব্যবসায়ী মহল। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, আওয়ামী আমলে বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত হওয়ার পরিবর্তে ইসলামী ব্যাংক আবারও নতুন কৌশলে একই বলয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
“ব্যাংক লুটেরাদের নতুন অভিভাবক?” রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুর নবী মানিক অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে “পুরস্কারস্বরূপ” ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়েছে।

তার দাবি, চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখার মাধ্যমে এস আলম গ্রুপকে নতুন করে ৫৪৪ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক মানিক আরও অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও বিতর্কের কারণে খুরশীদ আলম সমালোচিত ছিলেন এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে তার পরিবারের নামে নেওয়া ঋণ সংক্রান্ত প্রশ্নও রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের পরও কি বদলায়নি ব্যাংকিং খাত ?
আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইসলামী ব্যাংকের ওপর এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়। দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাধারণ আমানতকারী, গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন—ব্যাংকটি রাজনৈতিক প্রভাব ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের মতে, ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও ব্যাংক দখল ও অর্থ লুটের কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকলে গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা বাস্তবায়িত হবে না।
সাত দফা দাবিতে উত্তাল ইসলামী ব্যাংক. : গ্রাহক ফোরাম সাত দফা দাবি তুলে ধরেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগ। সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল। লুটপাটের সঙ্গে জড়িত কাউকে পরিচালনা পর্ষদে না রাখা। ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টের ১৮(ক) ধারা বাতিল। এস আলম গ্রুপের দখলকৃত সম্পদ বিক্রি করে লুট হওয়া অর্থ সমন্বয়।এস আলমকে কোনো ব্যাংকের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার সুযোগ না দেওয়া। ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িতদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
জলকামান, টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ—তবুও পিছু হটেননি গ্রাহকরা
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, একই দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করতে গেলে পুলিশ জলকামান, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ চালায়। এতে ৩০ জন গুলিবিদ্ধসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন বলে দাবি করা হয়।
তবে এসব বাধা সত্ত্বেও গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার ও ব্যবসায়ীরা আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন। পরদিনও ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: ইসলামী ব্যাংক কার হাতে?
বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হচ্ছে—আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংক কি সত্যিই প্রভাবমুক্ত হয়েছে, নাকি নতুন মুখের আড়ালে পুরোনো স্বার্থগোষ্ঠী আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে?
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, আমানতকারীদের আস্থা এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কার প্রক্রিয়ারও একটি বড় পরীক্ষা।
৫ আগস্টের গণআন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে চলমান বিতর্ক সেই আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে—এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের আর্থিক অঙ্গনে।
