পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল: নবান্নে পটপরিবর্তন ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি 

Uncategorized ইতিহাস ঐতিহ্য জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন রাজনীতি

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান  :  প্রাক-কথন: একটি যুগের অবসানঃ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন কেবল একটি সাধারণ ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং এটি সমকালীন দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির এক ঐতিহাসিক জলবিভাজক। দীর্ঘ দেড় দশকের (১৫ বছর) একচ্ছত্র শাসনের পর তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহীরুহসম রাজনৈতিক দুর্গের পতন ঘটেছে।


বিজ্ঞাপন

উগ্র জনমোহিনী নীতি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ এবং ‘বাঙালি অস্মিতা’র তাস খেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ২৯৪টি আসনের মধ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০৭টি আসনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। খোদ ভবানীপুর কেন্দ্রে নিজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা থেকে চরম শত্রুতে পরিণত হওয়া শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫,১০৫ ভোটের ব্যবধানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত পরাজয় এই পতনের গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

জোড়াফুলের অন্তর্ধান ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ  :  এই নির্বাচনি বিপর্যয় কেবল নবান্ন থেকে মমতার বিদায়ঘণ্টাই বাজায়নি, বরং তাঁর নিজের হাতে গড়া দল তৃণমূল কংগ্রেসকে এক নজিরবিহীন অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে। ভোটের ফলাফল প্রকাশের মাত্র এক মাসের মাথায় দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিধায়ক প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। নবনির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে।


বিজ্ঞাপন

বিধানসভার স্পিকার ইতিমধ্যেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যা দলের ওপর সুপ্রিমো মমতার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। মমতা চেয়েছিলেন প্রবীণ নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করতে, কিন্তু তাঁর পক্ষে মাত্র ২০ জন বিধায়কের সমর্থন ছিল। ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে তাঁর ডাকা প্রতিবাদ কর্মসূচিতে মাত্র ৮ জন বিধায়কের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, রাজকীয় অহংকারের পতনের পর আঞ্চলিক রাজনীতিতে তিনি কতটা একাকী ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।


বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬: আসন বিন্যাস :  ┌──────────────────────────────────────────────┐ │ বিজেপি (BJP): ২০৭ আসন (সংখ্যাগরিষ্ঠতা) │ ├──────────────────────────────┬───────────────┘ │ তৃণমূল (TMC): ৮০ আসন │ └──────────────────────────────┘ তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনই বর্তমানে বিদ্রোহী

পতনের সমাজতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক কার্যকারণঃ
আন্তর্জাতিক রাজনীতির তুলনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে মমতার এই পতনের পেছনে তিনটি প্রধান নিয়ামক কাজ করেছে:

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও ‘কাট-মানি’ সংস্কৃতি  :  শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে রেশন দুর্নীতি এবং তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের নেতাদের সীমাহীন অর্থলিপ্সা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। রাজ্যের প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মতে, নীতিহীন রাজনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক চুরির চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে দলটিকে।

আর জি কর কাণ্ড ও মধ্যবিত্তের মোহভঙ্গ  :  কলকাতার আর জি কর মেডিকেল কলেজে তরুণী চিকিৎসকের ওপর নৃশংস নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এবং তা ধামাচাপা দেওয়ার সরকারি অপচেষ্টা পশ্চিমবঙ্গের সুশীল সমাজ, যুবসমাজ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে পুরোপুরি ক্ষুব্ধ করে তোলে। যে নারী ভোটব্যাংক মমতার প্রধান শক্তি ছিল, তা এই একটি ঘটনায় সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে চলে যায়।

বিজেপির হিন্দু ভোট একীকরণ  : নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের সুনির্দিষ্ট নির্বাচনি কৌশল উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং সীমান্ত জেলাগুলোতে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটের এক অভূতপূর্ব মেরুকরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। বামপন্থী ও কংগ্রেসের ভোটব্যাংক প্রায় শূন্যে নেমে এসে সরাসরি বিজেপির ঝুলিতে পড়া এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান অনুঘটক।

বাংলাদেশের ওপর প্রভাব: তিস্তা ও ভূরাজনীতি  : বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক হিসেবে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী রাজ্যের এই রাজনৈতিক ভূমিকম্পের বহুমাত্রিক প্রভাব খতিয়ে দেখা আবশ্যক। ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের (বিজেপি) ডাবল ইঞ্জিন সরকার প্রতিষ্ঠার ফলে ঢাকার ফরেন পলিসিতে কিছু নতুন সমীকরণ যুক্ত হতে পারে:

তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি  : দীর্ঘ এক দশক ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একগুঁয়েমির কারণে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের পথ তাত্ত্বিকভাবে এখন কিছুটা মসৃণ হতে পারে। কেন্দ্রের মোদী সরকারের সঙ্গে ঢাকার তিস্তা চুক্তি সম্পাদনে এখন আর কলকাতার কোনো ‘আঞ্চলিক ভেটো’ বা রাজনৈতিক বাধা থাকছে না।

সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন নীতি  :  পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে বিএসএফ-এর কঠোরতা এবং ভারতের কেন্দ্রীয় নাগরিকত্ব আইন (CAA) ও এনআরসি (NRC) বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত হতে পারে। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক সীমান্তে সাময়িক উত্তেজনা বা সীমান্ত বাণিজ্যে নতুন শুল্ক নীতি আরোপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আদান-প্রদান  :  বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের কারণে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের যে নিবিড় সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল, তা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রাবল্যে কতটা অক্ষুণ্ণ থাকে, তা দেখার বিষয়। তবে কলকাতার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক যোগাযোগে নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা  :  পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই পরিবর্তন ইতিহাসের এক অমোঘ সত্যকে পুনরুত্থিত করে—গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনবিচ্ছিন্নতা এবং অহংকার কখনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার গ্যারান্টি হতে পারে না। অতীতে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা যেভাবে উল্কাবেগে এসেছিলেন, ঠিক একইভাবে দুর্নীতির চোরাবালিতে আটকে আজ তাঁর নিজের তৈরি করা সাম্রাজ্যই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। ওপার বাংলার এই পটপরিবর্তন এপার বাংলার রাজনীতি ও নীতিনির্ধারকদের জন্যও এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বার্তা বহন করে।

লেখক  :  প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া ও আন্তার্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

👁️ 48 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *