দুদকের নতুন নেতৃত্বে তিন অভিজ্ঞ মুখ  :  দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে নতুন প্রত্যাশা

Uncategorized আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নতুন নেতৃত্বে যোগ দিয়েছেন বিচারপতি এ. কে. এম. আসাদুজ্জামান, ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। আজ তারা দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।


বিজ্ঞাপন

অভিজ্ঞতা, বিচারিক দক্ষতা, প্রশাসনিক জ্ঞান ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই তিন ব্যক্তির যোগদানে দেশের দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানটিতে নতুন গতি সঞ্চারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

গত ১৭ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ৭-এর উপধারা (১)-এর বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ. কে. এম. আসাদুজ্জামানকে দুদকের চেয়ারম্যান এবং সাবেক সচিব ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিচারাঙ্গন থেকে দুদকের শীর্ষ পদে বিচারপতি আসাদুজ্জামান
দুদকের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ. কে. এম. আসাদুজ্জামান ১৯৫৯ সালের ১ মার্চ নওগাঁ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।


বিজ্ঞাপন

১৯৮৩ সালে জেলা আদালতের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে তিনি আইন পেশায় যাত্রা শুরু করেন। ১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এবং ২০০১ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। দীর্ঘ আইন পেশার পর বিচারপতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।


বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অবসর গ্রহণ করেন।
বিচারিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই সাবেক আপিল বিভাগের বিচারপতির নেতৃত্বে দুদক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত, অনুসন্ধান ও আইনি কার্যক্রমে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলে রয়েছে।

প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ড. জাহাঙ্গীর আলম খান
দুদকের নতুন কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান একজন অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সচিব। তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ১৯৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা। ১৯৬৩ সালের ৬ জুলাই মানিকগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে চাকরিতে যোগ দিয়ে তিনি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করেন।
সরকারি চাকরির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও আইন বিষয়ে একাডেমিক কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন ড. জাহাঙ্গীর আলম খান। ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশের কয়েকটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দুদকে যোগদানের আগে তিনি ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে আইনের অধ্যাপক এবং আইন মন্ত্রণালয়াধীন বিভিন্ন প্রকল্পে লিগ্যাল এক্সপার্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রশাসন, আইন ও মাঠপর্যায়ের সরকারি কার্যক্রমে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আর্থিক অনিয়ম ও মানিলন্ডারিং মোকাবিলায় অভিজ্ঞ ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া । অপর কমিশনার ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব খাতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৬৩ সালের ১৫ অক্টোবর কুমিল্লা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে বি.কম (সম্মান) ও এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ এবং এবি ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ, ব্যাংকিং বিভাগ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগ এবং আইবিএতে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ফিন্যান্স, বাণিজ্য, ক্যাশ ফ্লো, মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন, সম্পদ ও দায় মূল্যায়ন, ট্রান্সফার প্রাইসিং, মানিলন্ডারিং, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তার সহধর্মিণী মিসেস শারমিন আফরোজা ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি উইমেন্স ফেডারেশন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছেন।

তিন অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নতুন প্রত্যাশা দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পেশাগত পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নতুন কমিশনে বিচার, প্রশাসন, আইন, রাজস্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটেছে। বিচারপতি আসাদুজ্জামানের দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতা, ড. জাহাঙ্গীর আলম খানের প্রশাসনিক ও আইনবিষয়ক দক্ষতা এবং ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়ার আর্থিক ও রাজস্ব খাতের অভিজ্ঞতা দুদকের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশে দুর্নীতি, অর্থপাচার, সরকারি অর্থের অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে যখন জনমনে ব্যাপক আলোচনা, তখন নতুন নেতৃত্বের সামনে রয়েছে বড় ধরনের প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ।

দুদকের নতুন নেতৃত্ব কতটা স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রভাবমুক্ত অনুসন্ধান, দুর্নীতির অর্থের উৎস শনাক্তকরণ এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে নতুন কমিশন কতটা দৃঢ় অবস্থান নেয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনগণের আস্থা আরও কতটা বাড়বে।

নতুন নেতৃত্বের যোগদানের মধ্য দিয়ে তাই দুদকের সামনে শুধু দায়িত্ব পালনের নতুন অধ্যায়ই নয়, বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃশ্যমান অবস্থান নেওয়ার একটি বড় সুযোগও তৈরি হয়েছে।

👁️ 358 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *