ইলিশা ঘাটে সাংবাদিকদের ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলার অভিযোগ  :  বিআইডব্লিউটিএর ট্রাফিক ইনচার্জ জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর জাতীয় বরিশাল বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

ভোলা প্রতিনিধি  : ভোলার ইলিশা লঞ্চঘাটে যাত্রী হয়রানি, ঘাট ব্যবস্থাপনা ও নৌযান চলাচলসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করায় সাংবাদিকদের ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলে মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ভোলা নদী বন্দরের ট্রাফিক ইনচার্জ জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) এ ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা জানিয়েছেন।


বিজ্ঞাপন

একই সঙ্গে জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে পূর্বের কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সময় মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানো, দীর্ঘদিন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা এবং বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই এবং দায় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ মন্তব্যের অভিযোগ

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইলিশা লঞ্চঘাটে যাত্রী হয়রানি, ঘাট ব্যবস্থাপনা, নৌযান চলাচলসহ বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে তথ্য জানতে এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিতে সাংবাদিকরা বিআইডব্লিউটিএর ভোলা নদী বন্দরের ট্রাফিক ইনচার্জ জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন।

প্রশ্নের জবাব দেওয়ার একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা। তার এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগী সাংবাদিক তানজিল ও ইমন বলেন, সরকারি সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশ্ন করা সাংবাদিকদের দায়িত্বের অংশ। কোনো অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পরিচয়ে আখ্যায়িত করা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জেলার সিনিয়র সাংবাদিকরাও।


বিজ্ঞাপন

ভোলা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক হেলাল উদ্দিন গোলদার বলেন, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যম। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি গণমাধ্যমের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার আচরণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

কর্মচারী ইউনিয়ন থেকে কর্মকর্তা—রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ  :  সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, জাহাঙ্গীর হোসেন একসময় কর্মচারী ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওই সময় সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এবং সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, পরবর্তীতে কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরও তার রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাব বিস্তারের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। বিভিন্ন সময় তিনি নিজেকে ছাত্রলীগের নেতা এবং প্রভাবশালী হিসেবে পরিচয় দিতেন—এমন দাবিও করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে তার ছবি বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলেও সূত্রের দাবি। তবে এসব রাজনৈতিক যোগাযোগ বা ছবি কোনো অনিয়মের প্রমাণ কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রমাণ যাচাই প্রয়োজন।

ভৈরবে কর্মরত থাকাকালে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ  : জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে ভৈরবে কর্মরত থাকার সময় মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ উঠেছিল বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সে সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘যেখানে থাকেন, সেখানে মাদক’—কল রেকর্ডের দাবিও সামনে  :  এদিকে জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, তিনি যেখানে অবস্থান করেন সেখানে মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড রয়েছে—এমন বক্তব্যসংবলিত একটি কল রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

রেকর্ডটির উৎস, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, কণ্ঠের সত্যতা এবং আইনগত গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার পূর্বের কর্মস্থলগুলোতেও বিভিন্ন অভিযোগ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।

ইলিশা ঘাটের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন  :  ইলিশা লঞ্চঘাট ভোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-যোগাযোগ কেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী এ ঘাট ব্যবহার করেন। ফলে যাত্রী নিরাপত্তা, টিকিট ও ঘাট ব্যবস্থাপনা, নৌযান চলাচল, যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি—সবকিছুই জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তা আড়াল না করে তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা জরুরি। বিশেষ করে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছে সাংবাদিকরা যখন জনস্বার্থের প্রশ্ন নিয়ে যান, তখন তার বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত বলে মনে করছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।

‘ব্যক্তিগত বিষয়’ বললেন সহকারী পরিচালক  :  অভিযোগের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর ভোলা নদী বন্দরের সহকারী পরিচালক নির্মল বাবুর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য নেই এবং বিষয়টি জাহাঙ্গীর হোসেনের ব্যক্তিগত বিষয়। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলা ঠিক হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলেও জানান তিনি।

যা বললেন জাহাঙ্গীর হোসেন  :  অভিযোগগুলোর বিষয়ে ট্রাফিক ইনচার্জ জাহাঙ্গীর হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আপনাদের যদি কিছু বলার থাকে তাহলে ইলিশা ঘাটে আসেন, তারপর আপনাদের সঙ্গে কথা বলবো।”

তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র  :  একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব, পূর্বের কর্মস্থলে অনিয়ম, মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ, সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মের মতো একাধিক অভিযোগ উঠলে বিষয়গুলোকে শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, ইলিশা লঞ্চঘাটে যাত্রীসেবা ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম রয়েছে কি না, ট্রাফিক ইনচার্জ হিসেবে জাহাঙ্গীর হোসেন দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি করেছেন কি না, তার পূর্বের কর্মস্থলে ওঠা অভিযোগের কোনো প্রশাসনিক রেকর্ড রয়েছে কি না এবং রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে তিনি কখনো সুবিধা নিয়েছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ  : ভোলার গুরুত্বপূর্ণ ইলিশা লঞ্চঘাটের যাত্রীসেবা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগ এবং বিআইডব্লিউটিএর ট্রাফিক ইনচার্জ জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ বিভাগীয় তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। এতে ইলিশা ঘাটের ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও জনআস্থা দুটিই নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।

👁️ 416 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *