
নিজস্ব প্রতিনিধি, (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা এখন আতঙ্কের আরেক নাম। সীমান্তঘেঁষা এই জনপদে দিনের আলোয় যা দেখা যায়, রাতের আঁধারে তার চেয়েও ভয়ংকর এক অঘোষিত সাম্রাজ্য চালায় কথিত “স্টেশনের লোকমান” ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী “ইন্ডিয়ার রাজু” চক্র। স্থানীয়দের ভাষ্য—এরা শুধু একটি চক্র নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অপরাধ নেটওয়ার্ক, যার শেকড় ছড়িয়ে আছে সীমান্ত, স্টেশন, সড়কপথ এবং প্রশাসনের ভেতর পর্যন্ত।

সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি ! সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে সাংবাদিক দ্বীন ইসলামকে। অভিযোগ উঠেছে, এই হুমকি দিয়েছেন কথিত স্মাগলার চক্রের অন্যতম সদস্য “ইন্ডিয়ার রাজু”।
এ ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন—সীমান্তে কারা এত শক্তিশালী যে, তারা প্রকাশ্যে একজন সাংবাদিককে হত্যার হুমকি দিতে পারে?

স্থানীয়দের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের দাপটেরই ধারাবাহিকতা। সাংবাদিক, সচেতন নাগরিক বা প্রতিদ্বন্দ্বী—যেই হোক, কেউ কথা বললেই নেমে আসে ভয়ভীতি ও চাপে রাখার কৌশল।

সীমান্তপথে কোটি টাকার কারবার : অভিযোগ রয়েছে, সীমান্তপথে প্রতিদিন কোটি টাকার মাদক ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব চালান প্রথমে সীমান্ত এলাকায় রিসিভ করেন রাজুর লোকজন। পরে সেগুলো চলে আসে রেলস্টেশন ঘিরে গড়ে ওঠা আরেক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে—যেখানে প্রভাব বিস্তার করে লোকমানের চক্র।
বিশেষভাবে পরিবর্তিত (মডিফায়েড) প্রাইভেট কারের ভেতরে গোপন কুঠুরি বানিয়ে অস্ত্র ও মাদক দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। ফলে সীমান্ত থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে তৈরি হয়েছে একটি বিস্তৃত বিতরণ নেটওয়ার্ক।
“সবাই জানে, কিন্তু কেউ বলে না” : স্থানীয় প্রবীণদের অভিযোগ, মাদক ব্যবসা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দৃশ্যমান কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কারণ—লাভের অঙ্ক বিশাল। অভিযোগ আছে, প্রশাসনের একটি অসাধু অংশ নিয়মিত এই কারবার থেকে সুবিধা নেয়। ফলে মাঝেমধ্যে ছোটখাটো চালান ধরা পড়লেও ধরা পড়ে কেবল বহনকারী বা নিম্নস্তরের কর্মীরা।
মূল হোতারা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। একজন স্থানীয় ব্যবসায়ীর ভাষায়, “একটা চালান ধরা পড়লে খবর হয়, কিন্তু তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি চালান নির্বিঘ্নে ঢুকে যায়—সেটা কেউ দেখে না।”
মুখ খুললেই হুমকি ও ষড়যন্ত্র : চক্রটির বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই শুরু হয় ভয়ভীতি, মিথ্যা মামলার শঙ্কা, সামাজিক অপবাদ বা সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিক ক্ষেত্রে ‘দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার’ হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ নীরব। সবাই জানে, কিন্তু বলতে সাহস পায় না।
প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন : এত অভিযোগ, এত গুঞ্জন, এত আতঙ্ক—তবু বড় কোনো দৃশ্যমান অভিযান নেই কেন? সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এ ধরনের সংগঠিত চক্র দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকে—এ প্রশ্ন এখন জনমনে।
কসবার মানুষ জানতে চায়— সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি ? অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি ? নাকি ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতিই টিকে থাকবে?
সীমান্তের এই অঘোষিত সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জনপদজুড়ে।
