
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ভবনের সামনে প্রকাশ্যে এক শ্রমিক নেতার ওপর সংঘবদ্ধ হামলা, অপহরণের চেষ্টা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে।

হামলার শিকার ইসরাুরুল হাসান সুমন দাবি করেছেন, বিআইডব্লিউটিএ’র এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার নির্দেশে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা তার ওপর এ হামলা চালায়। ঘটনাটি নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ অঙ্গনসহ শ্রমিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী ইসরাুরুল হাসান সুমন বিআইডব্লিউটিএ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন বি-১৪৪০ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এবং বিআইডব্লিউটিএ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দুপুরের খাবারে যাওয়ার পথে হামলা : অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার দুপুর আনুমানিক ২টা ৪৫ মিনিটে মতিঝিলস্থ বিআইডব্লিউটিএ ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। সেদিন সকালে অফিস সহায়ক (হিসাব বিভাগ) ইসরাুরুল হাসান সুমনের সঙ্গে মূল অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা মাজহারুল ইসলামের দেখা হয়।

প্রতিদিনের মতো সুমন তাকে সালাম দিলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, “তুই নিজেকে অনেক সেয়ানা ভাবিস, তোকে আমি দেখে নিব।” সুমন বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে যান। পরে দুপুরে খাবারের উদ্দেশ্যে অফিসের পাশের হোটেলে যাওয়ার সময় হঠাৎ ১০-১২ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি তার পথরোধ করে। তাদের মধ্যে একজন বলে, “চুপ করে দাঁড়িয়ে থাক, নড়াচড়া করবি না।” এরপর তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
‘গুমের চেষ্টা’ ও পুলিশের ভ্যান আঁকড়ে বাঁচলেন সুমন :
ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, খলিল নামে এক ব্যক্তি তার গেঞ্জির কলার চেপে ধরে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও লাথি মারতে থাকে। পরে তাকে টেনে-হিঁচড়ে মতিঝিল সিটি টাওয়ারের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আগে থেকেই একটি গাড়ি প্রস্তুত রাখা ছিল।
সুমনের দাবি, তাকে জোরপূর্বক গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু জীবন বাঁচানোর তাগিদে তিনি রাস্তার পাশে থাকা পুলিশের ভ্যানের পেছনের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে রাখেন। এতে হামলাকারীরা তাকে গাড়িতে তুলতে ব্যর্থ হয়। তিনি বলেন, “আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন। না হলে সেদিন আমাকে কোথায় নিয়ে যেত জানি না।”
‘হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে দেব’ : হামলাকারীরা তাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে এবং বলে, “মাজহারুলের কথা না শুনলে হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে দেব। এটা লাস্ট ওয়ার্নিং, এরপর জীবনই নিয়ে নেব।”
এ সময় সুযোগ বুঝে হামলাকারীদের একজন তার পকেটে থাকা নগদ ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় বলেও অভিযোগ করেন সুমন।
‘আওয়ামী লীগের দোসর’ বলে মব তৈরির চেষ্টা : ঘটনার সময় আশপাশে লোকজন জড়ো হলে হামলাকারীরা সুমনকে “আওয়ামী লীগের দোসর” আখ্যা দিয়ে জনতার মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করে।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে হামলাকারীরা পুলিশের কাছেও একই অভিযোগ তুলে ধরে এবং দাবি করে, সুমন নাকি বিআইডব্লিউটিএ ভবনের ভেতরে থাকা শোক ব্যানার ছিঁড়েছে।
পরে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘটনাস্থলে এসে গুরুতর আহত অবস্থায় সুমনকে উদ্ধার করেন। তারা পুলিশকে জানান, সুমন দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করছেন এবং অতীতেও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
সংসদ সদস্যকে ফোন, পরে থানায় মুক্তি : ঘটনার পর সুমন তার নির্বাচনী এলাকা পাবনা সদর-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে ফোন করে বিষয়টি জানান।
পরে তার পরিচয় ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ তাকে ছেড়ে দিতে সম্মত হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে বিআইডব্লিউটিএ’র সহকারী সাহিকুল ইসলামের জিম্মায় তাকে থানাপুলিশ বুঝিয়ে দেয়।
ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা : অফিসে ফিরে সুমন তার শরীরের আঘাতের চিহ্ন, ছেঁড়া গেঞ্জি ও প্যান্ট কয়েকজন পরিচালকের কাছে প্রদর্শন করেন। কিছু সময় পর তার শরীরে তীব্র ব্যথা ও ফোলা দেখা দিলে সহকর্মীদের সহায়তায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় হামলা’ : ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তিনি কর্মচারীদের অধিকার, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। তিনি দাবি করেন, মাজহারুল ইসলাম কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখানো, বদলি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য ও টেন্ডার বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।
সুমনের ভাষ্য, “আমি তাকে একাধিকবার বলেছি— দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও কর্মচারীদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করুন। কর্মচারীদের সম্মান করলে তারাও সম্মান করবে। এসব কথা বলার কারণেই আমার ওপর হামলা চালানো হয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, অতীতেও মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ দাখিল : ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ সোমবার বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী সুমন।
অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান, সদস্য (পরিকল্পনা ও পরিচালন), সদস্য (অর্থ), সদস্য (প্রকৌশল) এবং হিসাব বিভাগের পরিচালকের দপ্তরে।
ঘটনাটি নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এ ধরনের সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি।
