
সাবেক ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝি।

বিশেষ প্রতিনিধি : ময়মনসিংহ রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর দায়িত্বকালীন কর্মকাণ্ড, পদায়ন বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব, বিরোধী মতের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৬ সালের ৮ জুন ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর দায়িত্বকালে ময়মনসিংহ রেঞ্জের বিভিন্ন থানায় ওসি পদায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অর্থ লেনদেন হতো।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। সমালোচকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মুখে প্রায়ই শোনা যেত—“বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের সাইজ করো।” অভিযোগকারীদের দাবি, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার পেছনেও তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।

স্থানীয় বিভিন্ন মহলে তাঁকে “টাকার মাঝি” নামেও অভিহিত করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার অভিযোগও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের দাবি, নিবাস চন্দ্র মাঝির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ এক সাবেক সংসদ সদস্যের আত্মীয়ের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় এবং তিনি গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে ওই মামলায় প্রায় দুই মাস পাঁচ দিন কারাভোগের পর আদালতে তিনি খালাস পান।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, কাঙ্ক্ষিত থানায় ওসি হিসেবে পদায়ন পেতে অনেক কর্মকর্তাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব অর্থ ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝির কাছে পৌঁছাত। একই সঙ্গে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত কিছু পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশাসনিকভাবে হয়রানি করার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর তিনজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই ব্যক্তিরা বর্তমানে বিপুল সম্পদের মালিক এবং এখনো পুলিশ বিভাগে কর্মরত রয়েছেন। তবে তাদের নাম ও পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অবৈধ সম্পদ অর্জন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি, সিলেটের কমিশনার এবং রাজশাহীর অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিবাস চন্দ্র মাঝি প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের একটি বড় অংশ বিদেশে, বিশেষ করে ভারতের কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হয়েছে।
সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ-এর আস্থাভাজন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত নিবাস চন্দ্র মাঝি বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিষয়গুলো স্পষ্ট করা জরুরি।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সাবেক ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, তাঁর বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহ প্রকাশ করা হবে।
