# দলিলভেদে হাজার থেকে লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ # জমির শ্রেণি জালিয়াতিতে রাজস্ব ফাঁকি # নকল তুলতেও উৎকোচ—অভিযোগের কেন্দ্রে জেলা রেজিস্ট্রার # সদর সাব-রেজিস্ট্রার ও প্রভাবশালী দালালচক্র #


নিজস্ব প্রতিনিধি (গাজীপুর) : গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় ও সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ঘুষ ও দালালচক্র—এমন অভিযোগে সামনে এসেছে উদ্বেগজনক নানা তথ্য।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে দলিলভেদে হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, ফাইল আটকে রেখে ঘুষ আদায় এবং নকল (সার্টিফাইড কপি) তুলতেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মতো অনিয়ম এখন যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান এবং সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, দলিলপ্রতি অফিস খরচের নামে নির্ধারিত কমিশনের বাইরেও একশ্রেণির চিহ্নিত দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জমির শ্রেণি জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া এবং বেশি মূল্যে সম্পাদিত বায়না দলিল গোপন রেখে পরবর্তীতে কম মূল্যে সাব-কবলা দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দলিল দাতা বা গ্রহীতার আয়করসংক্রান্ত টিআইএন (TIN) বা আয়কর রিটার্ন না থাকলে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। হেবা দলিলে ১০ শতাংশ পর্যন্ত জমির জন্য নেওয়া হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা, আর ১০ শতাংশের বেশি হলে দাবি করা হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। বিভিন্ন কোম্পানির ব্যাংক মর্টগেজ দলিলে ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী ঘুষের অঙ্ক দাঁড়ায় ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। বণ্টননামা দলিলে আদায় করা হয় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ভুল সংশোধন বা ঘোষণাপত্র দলিলে নেওয়া হয় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন মন্ত্রণালয়ে শক্তিশালী যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এই চক্র আরও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। কয়েকজন প্রভাবশালী সাব-রেজিস্ট্রারের ছত্রচ্ছায়ায় একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ।
এই সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ওমেদার সোহেল, কাশেম, রিপন ও রাব্বির নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলামের সময় থেকে তারা অফিসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে আসছেন।
শুধু দলিল নিবন্ধনই নয়, বালাম বই থেকে নকল বা সার্টিফাইড কপি তুলতেও সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রাখা হয় এবং সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয়।
এদিকে মারিয়ালীতে রেকর্ড রুম স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জেরে গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে জেলা ও সদর অফিসে নকল সরবরাহের কার্যক্রম মৌখিকভাবে বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গাজীপুর সদর, সালনাসহ বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে টিআইএন সনদের অজুহাত, দলিলের ছোটখাটো ভুলত্রুটি কিংবা জমির শ্রেণি পরিবর্তনের বিষয়কে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক অভিযানে গাজীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রায় ১৩ কোটি টাকার অডিট আপত্তি এবং নথিপত্রে ব্যাপক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এছাড়া সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কম মূল্যে জমি রেজিস্ট্রি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলা ও হাইকোর্টের তদন্তের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
একইভাবে সদর সাবেক যুগ্ম সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধেও অফিসের সিন্ডিকেট ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ওমেদার সোহেল, কাশেম, রিপন ও রাব্বিকে ঘিরে গড়ে ওঠা চক্রকে খাস কামরা নিয়ন্ত্রণ এবং সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের মূল শক্তি হিসেবে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ডিজিটাল ফাইলিং ব্যবস্থা চালু, সরকারি ফি কাঠামো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত এবং অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি; বরং একাধিকবার কল কেটে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
অন্যদিকে জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাঁর সহকারী জানান, ‘স্যার ব্যস্ত আছেন। পরে কল দিয়ে কথা বলিয়ে দেওয়া হবে।’ তবে পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদকের মন্তব্য : এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন হওয়া প্রয়োজন। অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
