
নিজস্ব প্রতিবেদক : জাল কাগজপত্রে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নেওয়ার অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী।

বিভাগীয় তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি নিজেই দোষ স্বীকার করেন। সরকারি নথি অনুযায়ী, শাস্তি হিসেবে তার এক বছরের একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়েছিল।
কিন্তু সেই শাস্তিই কি তার ক্যারিয়ারের শেষ হওয়ার কথা ছিল ? বাস্তবতা বলছে, উল্টো চিত্র। শাস্তির মাত্র তিন বছরের মধ্যে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং একই বছরের কয়েক মাসের ব্যবধানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হন।

পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার নতুন পরিচয় তৈরি করে পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে পেছনে ফেলে বসেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে।

এখন সেই পদ স্থায়ী করার দৌড়েও তিনি এগিয়ে—এমন অভিযোগ উঠেছে। আর তাকে ঘিরে বদলি-বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, প্রভাব খাটানো এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক বিস্ফোরক অভিযোগ—প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নগর গণপূর্ত বিভাগ ঢাকা-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানাকে অধিদপ্তরের ভেতরে ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ। তার বিরুদ্ধেও টেন্ডার কারসাজি, ঘুষ, প্রকল্প ব্যয় ফুলিয়ে দেওয়া, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।
জাল কাগজপত্রের অভিযোগ, দোষ স্বীকার—শাস্তি মাত্র এক বছরের বেতন বৃদ্ধি বন্ধ : গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নথিতে দেখা যায়, মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিদেশে উচ্চশিক্ষার ছুটি ও প্রেষণ ভোগের ক্ষেত্রে জাল কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল।
একটি সরকারি আদেশে বলা হয়, তিনি ভুয়া অফার লেটার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাগজপত্র তৈরি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করেছিলেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে তিনি দোষ স্বীকার করেন এবং অব্যাহতি প্রার্থনা করেন।
তদন্ত প্রতিবেদন, তার লিখিত জবাব, দোষ স্বীকারোক্তি ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে অভিযোগকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে প্রমাণিত ধরা হয়। এরপর সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তাকে এক বছরের জন্য একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করার লঘুদণ্ড দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, নথি অনুযায়ী অভিযোগটি নিছক গুজব ছিল না; বিভাগীয় তদন্তে তা প্রমাণিত হয়েছিল এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাও দোষ স্বীকার করেছিলেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এমন অভিযোগে দণ্ডিত একজন কর্মকর্তা কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রশাসনিক সিঁড়ি বেয়ে আরও ওপরে উঠলেন?

তিন বছরের মধ্যেই দুই দফা পদোন্নতি : সরকারি চাকরির সার্ভিস রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২২ জুলাই খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিয়মিত পদোন্নতি পান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে। একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর তিনি পদোন্নতি পান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কারণে এসব পদোন্নতিতে তিনি সুবিধা পেয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে তিনি ‘ফুপু’ হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং তার সুপারিশে প্রভাবশালী মহলে প্রবেশাধিকার তৈরি হয়েছিল। তবে এ দাবির সরাসরি প্রমাণ হিসেবে কোনো লিখিত সুপারিশপত্রের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে সাজেদ আকবর অবশ্য বলেছেন, একই নির্বাচনি আসনের হওয়ায় অনেকেই তার মায়ের কাছে যাতায়াত করতেন এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে অনেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করতেন। খালেকুজ্জামানকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না বলেও জানান।
অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ১১ বছর, পদোন্নতির সময় দেশে ফেরার অভিযোগ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তালিকা ও পার্সোনাল ডাটা শিট (পিডিএস) ঘেঁটে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনের দীর্ঘ সময়ে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে খালেকুজ্জামান চৌধুরী প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, দেশে পদোন্নতি বা গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলেই তিনি দেশে ফিরে আসতেন। তার বিদেশে অবস্থান, প্রেষণ, ছুটি ও দেশে ফেরার সময়গুলো সার্ভিস রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াত—ক্ষমতার পালাবদলে ‘নতুন পরিচয়’ ? ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খালেকুজ্জামান চৌধুরীর রাজনৈতিক যোগাযোগও বদলে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। তার পারিবারিক সূত্রে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে। তাহেরের স্ত্রী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরীকে (সুইটি) তিনি ‘ফুপু’ হিসেবে ডাকেন—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, খালেকুজ্জামানের বাবা বদিউজ্জামান চৌধুরী এবং তাহেরের শ্বশুর আহম্মদ উল্লাহ চৌধুরী আত্মীয়। এই সূত্রে পারিবারিক যোগাযোগকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের বিষয়।
অভিযোগ আরও গুরুতর—জামায়াতঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তৎকালীন গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলাম এবং ডা. তাহেরের প্রভাবেই ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে তাকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে তাকে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।

জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তিন নম্বর, অথচ শীর্ষে নাম : প্রধান প্রকৌশলীর পদ স্থায়ী করার লক্ষ্যে গত ৬ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নাম পাঠানো হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু এখানেই উঠেছে প্রশাসনিক জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ। দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ওপরে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের এবং উৎফল কুমার দে। জ্যেষ্ঠতার হিসাবে খালেকুজ্জামানের অবস্থান তৃতীয়। অন্যদিকে প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছেন মো. শহিদুল আলম এবং ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দারও। অভিযোগ হচ্ছে, জ্যেষ্ঠতার ক্রম অনুসরণ না করে খালেকুজ্জামানকে তালিকার শীর্ষে রাখা হয়েছে।
৪৭ প্রকৌশলীর নাম মামলায়—এসএসবিতে নথি পাঠিয়ে ‘বাধা সরানোর’ অভিযোগ : সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রধান প্রকৌশলীর পদে যাওয়ার পথ বন্ধ করতে তাদের বিরুদ্ধে জুলাই-পরবর্তী বিভিন্ন মামলার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নথির দাবি অনুযায়ী, রামপুরা থানার একটি মামলায় মোট ৪৭ জন প্রকৌশলীর নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রধান প্রকৌশলীর পদে বিবেচনাধীন কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নামও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব মামলার তথ্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি) পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে তৃতীয় অবস্থানে থাকা খালেকুজ্জামান চৌধুরীর শীর্ষ পদে যাওয়ার পথে প্রশাসনিক বাধা না থাকে। এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে মামলার এজাহার, চার্জশিট, নাম অন্তর্ভুক্তির সময়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং এসএসবিতে পাঠানো নথির উৎস স্বাধীন তদন্তে যাচাই করা জরুরি।
বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ: ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা !প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে নতুন করে অভিযোগের ঝড় ওঠে। দপ্তরসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৬৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের অভিযোগও উঠেছে।
তবে এত বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণে ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, মোবাইল আর্থিক সেবা, মধ্যস্থতাকারী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
একদিনে অর্ধশতাধিক বদলি, পরে অধিকাংশ বাতিল :
চলতি বছরের ৩ মার্চ পৃথক প্রজ্ঞাপনে একদিনে অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠে, মন্ত্রণালয়কে যথাযথভাবে অবহিত না করেই এত বড় প্রশাসনিক রদবদল করা হয়েছিল।
বিষয়টি নিয়ে প্রধান প্রকৌশলীকে ব্যাখ্যা দিতে তলব করা হয়। এরপর ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে অধিকাংশ বদলি বাতিল করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে—যদি বদলিগুলো নিয়মসিদ্ধ ও প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় হয়ে থাকে, তাহলে এত দ্রুত সেগুলোর বড় অংশ বাতিল হলো কেন?
বরখাস্ত প্রকৌশলীকে ‘ব্যাকডেটে’ বদলির রহস্য : মো. সাইফুজ্জামান নামে এক প্রকৌশলীকে ঘিরে নথির তারিখ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ৩ ফেব্রুয়ারির আদেশে দুর্নীতির দায়ে সাইফুজ্জামানকে বরখাস্ত করা হয়।
ওই আদেশে তাকে লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি আদেশে দেখা যায়, ২ ফেব্রুয়ারি—অর্থাৎ বরখাস্তের এক দিন আগে—তাকে ঢাকার রিজার্ভে বদলি দেখানো হয়েছে।
একজন কর্মকর্তার বরখাস্তের এক দিন আগে বদলির আদেশ জারি হয়ে তা প্রায় দুই সপ্তাহ পর প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে তদন্তের দাবি রাখে। নথির এই অসামঞ্জস্য কি প্রশাসনিক ভুল, নাকি বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাকে পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরির চেষ্টা—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
‘কমিশন’ না পেলে টেন্ডার পুনর্মূল্যায়ন ? বদলি-বাণিজ্যের পাশাপাশি বড় প্রকল্পের দরপত্র নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, বিভাগ-৩ এবং শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২-এর অধীনে বড় অঙ্কের পাঁচটি দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য ফেরত পাঠানোর ঘটনা সামনে এসেছে।
প্রশাসনিকভাবে এর পেছনে পিপিআর ২০২৫-এর বিধি বা কারিগরি ত্রুটির কথা বলা হলেও অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃত কারণ ছিল কমিশন নিয়ে অসন্তোষ।
এ অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ঘুষের অভিযোগ নয়; সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।

সামনে আরেক নাম—‘মিস্টার ১৫%’ মাসুদ রানা : খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে অভিযোগের সঙ্গে ঘুরেফিরে সামনে আসছে নগর গণপূর্ত বিভাগ ঢাকা-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার নাম। অধিদপ্তরের ভেতরে তাকে ‘মিস্টার ১৫%’ এবং খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ দায়িত্ব পালনকালে প্রায় হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, দরপত্রের তথ্য ফাঁস, দর-কষাকষির নামে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়েছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নেওয়া হয়েছে এবং এসব অর্থের একটি অংশ প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের আর্থিক সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রাক্কলন, দরপত্র নথি, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার এবং ব্যাংক হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কাজ না করেও বিল? ভুয়া ভাউচারের অভিযোগ : মাসুদ রানার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ—কাজ বাস্তবায়ন না করেও ভুয়া ভাউচার ও কাজ দেখিয়ে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
বিভিন্ন খাতে বরাদ্দের বাইরে বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য ব্যয়ের নামে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; সরকারি অর্থ আত্মসাতের ফৌজদারি অভিযোগের পর্যায়ে যেতে পারে।
শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ : মাসুদ রানার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ তার কথিত বিপুল সম্পদ নিয়ে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিজের, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নামে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ও দোকান রয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা সম্পদের মধ্যে রয়েছে, গুলশানে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট; রামপুরা বনশ্রীতে ব্লক-ডি, ৫৪/ডি ঠিকানায় পাঁচতলা বাড়ি; বনশ্রী এফ ব্লকের ৭৯/১/এফ, মোল্লা ম্যানশনে ১২০০ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট; বসুন্ধরা সিটির পঞ্চম তলায় বি ব্লকের ৫৯/বি ও ৭৮/বি নম্বরের দুটি দোকান; মোহাম্মদপুর বাবর রোডে ১০ কাঠার প্লট; রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আরও জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট।
অভিযোগকারীরা এসব সম্পদের মোট মূল্য প্রায় শত কোটি টাকা বলে দাবি করছেন। তবে কোনো সম্পদ অবৈধ কি না, তা নির্ধারণে দলিল, ক্রয়মূল্য, বাজারমূল্য, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব এবং বৈধ আয়ের উৎস পর্যালোচনা অপরিহার্য।
‘ক্ষমতা বদলালেই আত্মীয়তা বদলায়’—সাজেদ আকবর
সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে সাজেদ আকবর বলেন, একই নির্বাচনি আসনে বাড়ি হওয়ায় অনেকেই তার মায়ের কাছে আসতেন এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে কেউ কেউ আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করতেন। ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর তারা নতুন ক্ষমতাবানদের সঙ্গেও আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করতেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।খালেকুজ্জামানকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না এবং তার মায়ের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল কি না, সেটিও জানা নেই বলে জানান সাজেদ আকবর।
‘প্রমাণিত দুর্নীতিবাজকে প্রতিষ্ঠানের প্রধান করা ঝুঁকিপূর্ণ’ : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, জালিয়াতি ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কোনো কর্মকর্তা প্রমাণিত হলে তাকে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান করা রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তার মতে, বাংলাদেশে এক শ্রেণির কর্মকর্তা প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে নতুন পরিচয় তৈরি করে সুবিধা নেন। এতে প্রকৃত সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হন।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পদপদবি পাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে নিয়োগ ও পদায়নের আগে কর্মকর্তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড গভীরভাবে যাচাই করা দরকার।
দুদকে লিখিত অভিযোগ, এখন তদন্তের অপেক্ষা :
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নথি জালিয়াতি, বদলি-বাণিজ্য, টেন্ডারে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগে বদলি ও পদায়নের আর্থিক লেনদেন : সাইফুজ্জামানের বদলির নথি, উচ্চমূল্যের টেন্ডার পুনর্মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের তদন্ত চাওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন অভিযোগের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, নথি ও অর্থের গতিপথ অনুসরণ করে তদন্ত।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তার সার্ভিস রেকর্ড, বিভাগীয় মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি, পদোন্নতির ফাইল, জ্যেষ্ঠতার তালিকা, এসএসবিতে পাঠানো কাগজপত্র, বদলি আদেশ, টেন্ডার নথি এবং সম্পদ বিবরণী একসঙ্গে পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। একইভাবে মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ওঠা সম্পদ ও ঘুষের অভিযোগের ক্ষেত্রেও আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্পত্তির দলিল, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের আর্থিক লেনদেন যাচাই জরুরি।
বক্তব্যের সুযোগ পাওয়া যায়নি : প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বক্তব্য জানতে ১০ আগস্ট তার দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধেও উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান পদ কি যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয়, আত্মীয়তার নেটওয়ার্ক ও আর্থিক প্রভাবই হয়ে থাকবে পদোন্নতির অদৃশ্য সিঁড়ি ?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু খালেকুজ্জামান চৌধুরী বা মাসুদ রানাকে ঘিরে নয়; এটি পুরো গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন ? ।
