গুলশানের ১১৪ কাঠা জমি ঘিরে ওয়াসার ‘তড়িঘড়ি’ উদ্যোগ !  টিআইবির বিস্ফোরক প্রশ্ন  : সরকারি সম্পত্তি কি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের হাতে ?

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সংগঠন সংবাদ সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  রাজধানীর অভিজাত গুলশান এলাকায় ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ঢাকা ওয়াসা) ১১৪ কাঠা জমি ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি আবাসন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ওই জমিতে আবাসন ভবন নির্মাণে ওয়াসার তড়িঘড়ি উদ্যোগকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির ভাষায়, এই উদ্যোগ জমি দখলবাজির একটি চক্রান্তে সহায়ক ভূমিকা রাখার শামিল এবং এর পেছনে স্বার্থান্বেষী মহলের কারসাজির আশঙ্কা রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে টিআইবি বলেছে, এমন নিয়মবহির্ভূত ও অনৈতিক প্রস্তাব পাওয়ার পরই তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে প্রস্তাব বিবেচনার নামে কমিটি গঠনসহ একের পর এক প্রক্রিয়া গ্রহণের মধ্য দিয়ে সরকারি সম্পত্তি একটি প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার যোগসাজশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ঢাকা ওয়াসা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানটির সম্পদের মালিকানা মূলত জনগণের। ফলে এ ধরনের সম্পদ ব্যবহার করে কোনো উন্নয়ন বা নির্মাণকাজ করতে হলে স্বচ্ছ, উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।


বিজ্ঞাপন

কিন্তু গুলশানের মতো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান এলাকায় থাকা ১১৪ কাঠা জমির ক্ষেত্রে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একক প্রস্তাবের ভিত্তিতে ওয়াসার ভবন নির্মাণের উদ্যোগ কেন নেওয়া হলো—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।


বিজ্ঞাপন

টিআইবির অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিকাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মৌলিক নীতিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আরও গুরুতর বিষয় হলো—যে প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার কথা, সেটিই ‘বিবেচনা’র নামে কমিটি গঠন করে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামানের ভাষায়, এটি নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; বরং প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমি দখলবাজির চক্রান্তের সঙ্গে বাস্তবে যোগসাজশের ভূমিকা নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। তিনি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে উদ্যোগটি অবিলম্বে বাতিল এবং পুরো বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
রাজউক জানে না, তবু ওয়াসার উদ্যোগ—উঠছে বড় প্রশ্ন :  বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে জমিটির মালিকানা ও ব্যবহারসংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে। টিআইবির দাবি, রাজউক থেকে ইজারাপ্রাপ্ত জমি উন্নয়নের নামে একটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজউক এ বিষয়ে অবগত নয়।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—রাজউক থেকে ইজারাপ্রাপ্ত সরকারি জমির উন্নয়ন বা ব্যবহার নিয়ে যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই অবগত না থাকে, তাহলে ওয়াসার ভেতরে কার উদ্যোগে এবং কী স্বার্থে এত দ্রুত এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে?

টিআইবির ভাষ্য অনুযায়ী, এর পেছনে স্বার্থান্বেষী মহলের কারসাজি এবং বিশেষ গোষ্ঠীগত স্বার্থ কাজ করার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রের সম্পত্তি যদি কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিল ও মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়—রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার ওপরও বড় আঘাত।

ওয়াসার ভেতরেও আপত্তি  :  বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঢাকা ওয়াসার কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটির একাংশের আপত্তির কারণে। অর্থাৎ প্রস্তাবটি নিয়ে ওয়াসার অভ্যন্তরেই মতবিরোধ বা আপত্তির বিষয়টি সামনে এসেছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন হলো—অভ্যন্তরীণ আপত্তি থাকা সত্ত্বেও ১১৪ কাঠার মতো বিপুল ও মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি নিয়ে এমন উদ্যোগ কেন এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে? কার স্বার্থে? কোন আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তিতে?

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য—প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কোনো ধরনের চাপের মুখে নয়, বরং ঢাকা ওয়াসার স্বার্থ বজায় রেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে টিআইবির বক্তব্য, বিষয়টি কেবল ‘প্রাথমিক পর্যায়ে’ থাকার কারণে উদ্বেগের অবসান হচ্ছে না। বরং প্রাথমিক পর্যায়েই যদি অনিয়মের আশঙ্কা থাকে, তাহলে প্রক্রিয়াটি থামিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত করাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

“উন্নয়ন’ নাকি সরকারি সম্পত্তি হস্তান্তরের ফাঁদ”  ?  গুলশানের ১১৪ কাঠা জমির মতো মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি উন্নয়নের প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবেই জনস্বার্থ, সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের ভিত্তিতে যদি সরকারি সম্পত্তি উন্নয়নের পথ তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি নিছক উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না।

বরং সেখানে স্বার্থের সংঘাত, প্রভাব খাটানো, একক প্রতিষ্ঠানের সুবিধা সৃষ্টি এবং সরকারি সম্পত্তির সম্ভাব্য অপব্যবহারের প্রশ্ন সামনে আসবেই।

টিআইবিও তাই স্পষ্ট করে বলেছে, ওয়াসা যদি সত্যিই তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে ওই জমিতে ভবন নির্মাণ বা কোনো উন্নয়নমূলক কার্যক্রম করতে চায়, তাহলে প্রথমে তার যথার্থতা যাচাই করতে হবে। এরপর বিদ্যমান নীতিকাঠামো অনুসরণ করে উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্তের দাবি
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক একই সঙ্গে দাবি জানিয়েছেন, ঢাকা ওয়াসা যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক চাপ, ভয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় ‘কে প্রস্তাব দিয়েছে’—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘রাষ্ট্রের স্বার্থ কোথায়’। গুলশানের ১১৪ কাঠা জমির ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত যেকোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তই স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ ও বিতর্কের জন্ম দেবে।

এখন দেখার বিষয়, ঢাকা ওয়াসা এই বিতর্কিত উদ্যোগ থেকে সরে এসে স্বচ্ছ তদন্ত ও উন্মুক্ত প্রক্রিয়ার পথে হাঁটে, নাকি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের এই প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়াই এগিয়ে নেয়।

জনগণের সম্পত্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত জনগণের স্বার্থেই হবে—নাকি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে, গুলশানের ১১৪ কাঠা জমিকে ঘিরে এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে।

👁️ 23 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *