!!  ফায়ার সার্ভিসের সাবেক ডিজি জাহেদ কামালকে ঘিরে সম্পদ ও নিয়োগ অনিয়মের অভিযোগ  !!   রাজধানী ও আশপাশে স্ত্রীসহ একাধিক জমি, প্লট-ফ্ল্যাটের তথ্য—নিয়োগে ১৮–২০ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ !! দুদক অভিযানও হয়েছিল  !!  স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ !!

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সংগঠন সংবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালকে ঘিরে বিপুল স্থাবর সম্পদ, নিয়োগে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।


বিজ্ঞাপন

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাঁর এবং তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তারের একক ও যৌথ মালিকানায় একাধিক জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্য সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। এসব সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস এবং তাঁর সরকারি আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগের বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা বা অসত্যতা স্পষ্ট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


বিজ্ঞাপন

বসুন্ধরা-সংলগ্ন এলাকায় জমি-ফ্ল্যাটের তথ্য  :  অনুসন্ধানে প্রাপ্ত দাপ্তরিক নথির বরাতে জানা গেছে, বসুন্ধরা-সংলগ্ন জোয়ার সাহারা, ডুমনি, পূর্বাচল ও রূপগঞ্জ এলাকায় জাহেদ কামাল ও তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তারের নামে একাধিক স্থাবর সম্পদের তথ্য রয়েছে।
নথিতে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, জোয়ার সাহারায় ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে সম্পাদিত ৯৬৮০ নম্বর দলিলের আওতায় ০.৪৯০১ একর জমির ওপর ১১০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ও পার্কিংয়ের তথ্য রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া ডুমনি মৌজায় ৬/১৯ নম্বর জোতে ৪.৯৫ শতক এবং ১৪৩০/১৯ নম্বর জোতে আরও ৪.৯৫ শতক জমির যৌথ মালিকানার তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে। পূর্বাচলের কুতুবপুর মৌজায় ৪৫৮৬ নম্বর জোতে ৪.৯৫ শতক জমির একটি প্লট এবং রূপগঞ্জের নাওড়া মৌজায় ৯৯৭৬ নম্বর জোতে ৮.২৬ শতক জমির তথ্যও সংশ্লিষ্ট নথিতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব সম্পদের মালিকানা ও অর্জনের সময়কাল, ক্রয়মূল্য এবং অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি যাচাই করা হলে সম্পদ অর্জনের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

সরকারি আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন  : 
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—একজন সামরিক কর্মকর্তার সরকারি বেতন-ভাতা, বৈধ আয়, ব্যাংকঋণ এবং অন্যান্য ঘোষিত আয়ের সঙ্গে উল্লিখিত সম্পদ অর্জনের অর্থের সামঞ্জস্য কতটা ?
তাঁদের দাবি, সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব এবং জমি-ফ্ল্যাট ক্রয়ের অর্থের উৎস পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তারের নামে বা যৌথ মালিকানায় থাকা সম্পদগুলোর অর্থের উৎসও পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগে ১৮–২০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ
জাহেদ কামালকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে।

২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ফায়ার সার্ভিসের একটি নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলেন চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁরা নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল এবং তৎকালীন ডিজি জাহেদ কামালের অপসারণ দাবি করেন।
এরপর ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাকরিপ্রার্থীরা অভিযোগ করেন, নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ অনুযায়ী, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিল।

স্বচ্ছ নিয়োগের কথা বলেছিলেন জাহেদ কামাল  :  অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথা জানানো হয়। সে সময় জাহেদ কামাল জানিয়েছিলেন, নিয়োগের বিভিন্ন ধাপে সিসি ক্যামেরা, ড্রোন ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফলে একদিকে স্বচ্ছ নিয়োগের উদ্যোগের ঘোষণা, অন্যদিকে এর আগে নিয়োগে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বড় অঙ্কের অর্থ দাবির অভিযোগ—দুই বিষয়ই পাশাপাশি যাচাইয়ের দাবি রাখে।

বদলি-পদায়ন, কেনাকাটা ও লাইসেন্স নিয়েও অভিযোগ  : 
জাহেদ কামালের দায়িত্বকালে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের বদলি, পদায়ন, কেনাকাটা, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স কার্যক্রম নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী চক্র এসব কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করত এবং জাহেদ কামালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতেন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বদলি বাণিজ্য, শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং বিভিন্ন সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ।

এসব অভিযোগের প্রতিটির সত্যতা যাচাই করতে বদলি-পদায়নের আদেশ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরির রেকর্ড, ক্রয়সংক্রান্ত টেন্ডার ও কার্যাদেশ, প্রশিক্ষণ এবং লাইসেন্স সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

২০২৪ সালেই দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযান  অভিযোগগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিলের একটি ঘটনা। ওই দিন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান চালায়। অভিযানের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলা এবং বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহের কথাও জানানো হয়েছিল।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সেই অভিযানে কী তথ্য বা নথি পাওয়া গিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তার অগ্রগতি কোথায়—তা জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

নতুন ডিজি, সেনাবাহিনীতে ফিরলেন জাহেদ কামাল  :  এদিকে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদকে নতুন ডিজি করা হয়েছে। একই আদেশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার পরও তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে ওঠা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তির প্রশ্নটি তাই নতুন করে সামনে এসেছে। কারণ কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পরিবর্তন বা অন্যত্র প্রত্যাবর্তন করলেই তাঁর দায়িত্বকালে উত্থাপিত অভিযোগের প্রশাসনিক বা আইনগত অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায় না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রশ্ন  :  ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। অগ্নিনিরাপত্তা, উদ্ধার কার্যক্রম, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জননিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, বদলি-পদায়ন, সরকারি ক্রয় ও সেবার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তাই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট মহলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাবি উঠেছে—জাহেদ কামালের দায়িত্বকালীন সময়ের সম্পদ, নিয়োগ, বদলি-পদায়ন, সরকারি ক্রয় এবং লাইসেন্সসংক্রান্ত অভিযোগগুলো নিয়ে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক অনুসন্ধান করা হোক।

বিশেষ করে— তাঁর ও তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তারের নামে থাকা জমি, প্লট ও ফ্ল্যাটের মালিকানা ও ক্রয়মূল্য যাচাই; এসব সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস এবং আয়কর নথির সঙ্গে সামঞ্জস্য পরীক্ষা; সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লেনদেন ও সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা; ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ১৮–২০ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ যাচাই; নিয়োগসংক্রান্ত সিন্ডিকেটের অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধান; ২৪ এপ্রিল ২০২৪-এর দুদক এনফোর্সমেন্ট অভিযানের পরবর্তী কার্যক্রম পর্যালোচনা;
বদলি-পদায়ন, পুনর্বহাল, সরকারি ক্রয়, প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স কার্যক্রমে ওঠা অভিযোগ যাচাই এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত— এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি পরীক্ষা করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের প্রতিটি বিষয়ই তদন্তে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে। তাই অভিযোগকারীদের বক্তব্যের পাশাপাশি জাহেদ কামাল, তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ, সরকারি নথি যাচাই এবং প্রয়োজনে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুসন্ধানই হতে পারে প্রকৃত চিত্র বের করার পথ।
জনস্বার্থে এখন মূল প্রশ্ন—ফায়ার সার্ভিসের সাবেক ডিজির দায়িত্বকাল ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি নথিভিত্তিক নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেবে ?

👁️ 38 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *