গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েই পাবনায় অফিস  :  বিআরটিএর সহকারী পরিচালক আলতাবের শত কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, দুদকের মামলা-চার্জশিটের পরও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেই

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত

বিআরটিএ’র আলোচিত-সমালোচিত সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন।


বিজ্ঞাপন

 

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) একজন সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন। পদটি সহকারী পরিচালকের হলেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাপ্তি যেন তার চেয়েও বহুগুণ বড়। দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলা, চার্জশিট, আদালতের মাধ্যমে সম্পত্তি ক্রোক এবং সর্বশেষ গ্রেফতারি পরোয়ানা—এত কিছুর পরও বহাল তবিয়তে সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বর্তমানে তিনি বিআরটিএর পাবনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত।

দুদকের অনুসন্ধান ও মামলার নথি অনুযায়ী, মো. আলতাব হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মোছা. জিয়াসমীন আরার নামে ঢাকা ও ফরিদপুরে ১৭টি স্থানে জমি, প্লট ও বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আলতাব হোসেনের নামে ফরিদপুরে ১২টি স্থানে জমি রয়েছে। কাগজপত্রে এসব সম্পত্তির মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৩৫ লাখ টাকা। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য ঘোষিত মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগের সবচেয়ে বড় অংশ রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানকে ঘিরে। আলতাব হোসেনের নামে গুলশানে একটি প্লট ও বাড়ি রয়েছে, যার কাগজপত্রে মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অভিযোগকারীদের দাবি, সম্পত্তিটির বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত শত কোটি টাকা।


বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, তাঁর স্ত্রী জিয়াসমীন আরার নামে ঢাকায় দুটি প্লট ও বাড়ির মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ফরিদপুরে তাঁর নামে আরও দুটি প্লট ও জমির মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৩ লাখ টাকা। দুদক-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য অনেক বেশি। তবে দুদকের দায়ের করা মামলায় সম্পত্তিগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য নয়, কাগজপত্রে উল্লেখ করা মূল্যই হিসাবের আওতায় নেওয়া হয়েছে।

দুদকের দুই মামলা, অবৈধ সম্পদ ও তথ্য গোপনের অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানের পর ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সংস্থাটির ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ উপপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে আলতাব হোসেন ও তাঁর স্ত্রী জিয়াসমীন আরার বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন।

প্রথম মামলার এজাহার অনুযায়ী, আলতাব হোসেন দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৩ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রদান করেছেন। একই অনুসন্ধানে তাঁর জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৯৩ টাকার সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় মামলায় তাঁর স্ত্রী মোছা. জিয়াসমীন আরাকে প্রধান আসামি এবং আলতাব হোসেনকে সহযোগী আসামি করা হয়। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, জিয়াসমীন তাঁর সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯৯ টাকার সম্পদের বিষয়ে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়েছেন। দুদকের অনুসন্ধানে তাঁর নামে ২ কোটি ৪২ লাখ ২ হাজার ২৫১ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়ার কথা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

জিয়াসমীন আরা গৃহিণী হওয়ায় তাঁর নামে এত সম্পদ অর্জনের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দুদক। মামলায় তাঁকে আলতাব হোসেনের দুর্নীতির অর্থে সম্পদ অর্জনে সহযোগিতার অভিযোগে আসামি করা হয়েছে। দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে দুই মামলাতেই চার্জশিট দেওয়া হয়।

১৭টি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ  :  দুদকের মামলার পরও বিষয়টি থেমে থাকেনি। আদালতের আদেশে আলতাব হোসেন ও তাঁর স্ত্রী জিয়াসমীন আরার সম্পত্তি ক্রোকের প্রক্রিয়াও শুরু হয়। ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ সাব্বির ফায়েজের আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন ও তাঁর স্ত্রী জিয়াসমীন আরার ১৭টি স্থানে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন।

তবে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের সন্তানদের নামে কেনা এবং আলতাব হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন হলেও বেনামে কেনা সম্পত্তিগুলো ওই ক্রোক আদেশের আওতার বাইরে রয়েছে।

গ্রেফতারি পরোয়ানা, তবুও বহাল তবিয়তে চাকরি  :  মামলা ও সম্পত্তি ক্রোকের পর সর্বশেষ আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে এ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

পরোয়ানার কপি তাঁর কর্মস্থল পাবনার পুলিশ সুপার এবং তাঁর গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে পাঠানো হয়। গত ১৪ মে পরোয়ানাটির কপি পাবনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

কিন্তু এরপরও আলতাব হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়নি। উল্টো তিনি নিয়মিতভাবে পাবনায় বিআরটিএ কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরও একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে নিয়মিত অফিস করছেন—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

পুলিশ জানে, কর্তৃপক্ষও জানে—তবু নীরবতা কেন ? সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে। একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের মামলা হয়েছে। মামলায় চার্জশিট হয়েছে। আদালত তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন। সর্বশেষ তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে।

তারপরও তিনি সরকারি দায়িত্বে বহাল রয়েছেন !   অভিযোগ রয়েছে, সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত, দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার কিংবা প্রশাসনিকভাবে সংযুক্ত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও আলতাব হোসেনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি গ্রেফতারি পরোয়ানা পাবনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পৌঁছানোর পরও কেন তা কার্যকর হয়নি, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

শত কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগের উৎস কোথায় ?দুদকের মামলায় যে সম্পদের মূল্য দেখানো হয়েছে, তার বাইরেও আলতাব হোসেনের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ও প্লট, ফরিদপুরে বিস্তর ভূসম্পত্তি এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে বিপুল অর্থ থাকার অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর বিষয়ে আদালতের রায় বা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিদেশে অর্থ পাচার এবং মামলার বাইরে থাকা সম্পদের বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই ও তদন্তের দাবি রাখে। দুদকের অনুসন্ধানে আলতাব হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর নামে যে সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে, তার সঙ্গে তাঁদের বৈধ আয়, সম্পদ বিবরণী এবং বাস্তব সম্পদ পরিস্থিতির সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ?  
একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা, চার্জশিট, সম্পত্তি ক্রোক এবং গ্রেফতারি পরোয়ানার মতো একাধিক গুরুতর আইনি পদক্ষেপের পরও তিনি কীভাবে একই পদে বহাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে। বিশেষ করে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা নিয়মিত অফিস করলে তাঁর দাপ্তরিক কার্যক্রমের বৈধতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

এ ঘটনায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে—দুদকের মামলা, চার্জশিট, সম্পত্তি ক্রোকের আদালতের আদেশ এবং গ্রেফতারি পরোয়ানার পরও কেন আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাবনার পুলিশ প্রশাসনের কাছেও প্রশ্ন—১৪ মে গ্রেফতারি পরোয়ানা গ্রহণের পরও কেন তা কার্যকর হয়নি?

চেয়ারম্যানের কোনো জবাব নেই  :  আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা, সম্পত্তি ক্রোক এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এ বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দুদকের মামলা থেকে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা—সবকিছুর পরও বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন কীভাবে বহাল তবিয়তে সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন?

এখন নজর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ এবং পুলিশ প্রশাসনের দিকে—আদালতের আদেশ ও দুদকের মামলার পরও এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কী কারণে এমন নীরবতা, তার জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কি না—সেটিই দেখার বিষয়।

👁️ 49 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *