একদিনে চার পদোন্নতিতে সচিব, এরপর সম্পদ ও ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ : সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে তোলপাড় !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

# তুষারধারায় ২৪ কাঠা জমিতে বহুতল ভবন # অকুপেন্সি সনদ ছাড়াই বসবাসের অভিযোগ # ফ্রেন্ডস ভিউ টাওয়ার ও মিশন সাগরিকা এপার্টমেন্ট নিয়েও প্রশ্ন # গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি #


বিজ্ঞাপন
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম।

 

বিশেষ প্রতিবেদক  :  ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর নিজেকে বৈষম্যের শিকার দাবি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে একদিনে চারটি পদোন্নতি পেয়ে সচিব হওয়ার অভিযোগে আলোচনায় আসেন সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার হরিপুর গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই আমলাকে ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠেছে তাঁর পদোন্নতির প্রক্রিয়া, কথিত সিন্ডিকেটের প্রভাব, সম্পদ অর্জন এবং রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ভবন নির্মাণে বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড নিয়ে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে নজরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি প্রভাবশালী বলয়। এই বলয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকারি দপ্তরে প্রভাব বিস্তার, বদলি ও পদায়নে সুবিধা আদায়, আত্মীয়স্বজনকে প্রশাসনিক সুযোগ পাইয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ ও ফ্ল্যাট বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের তুষারধারা আবাসিক এলাকাসহ ঢাকা, কুমিল্লা ও বুড়িচংয়ে এই বলয়ের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট-প্লট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে।

একদিনে চার পদোন্নতি: কীভাবে সচিব হলেন নজরুল ইসলাম ?   অভিযোগকারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রশিবির সভাপতি হিসেবে পরিচিত নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে বিসিএস ক্যাডারে যোগ দেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে একদিনে চারটি পদোন্নতি পেয়ে সচিব হওয়ার বিষয়টি তাঁর প্রশাসনিক উত্থান নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিজেকে বৈষম্যের শিকার হিসেবে উপস্থাপন করে পদোন্নতির সুযোগ নেওয়ার পর তিনি বিভিন্ন সমিতি ও সংগঠনের ব্যানারে সরকারি দপ্তরের সভাকক্ষে সভা ও মিলনমেলার আয়োজন করতেন।


বিজ্ঞাপন

এসব সংগঠনের কয়েকটির পরিচয়, নিবন্ধন, কার্যক্রম এবং সরকারি দপ্তরের সভাকক্ষ ব্যবহারের অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নজরুল ইসলামের পদোন্নতির প্রতিটি ধাপের আদেশ, তারিখ, পদ ও গ্রেড কী ছিল ? পদোন্নতিগুলো কোন বিধি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল? একই দিনে চারটি পদোন্নতির বিষয়টি সরকারি নথিতে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ? এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।


বিজ্ঞাপন

কথিত ক্যাশিয়ার তোফায়েলকে ঘিরে নিয়োগ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ  :  নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত : তোফায়েলকে ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা তাঁকে নজরুল ইসলামের কথিত ‘ক্যাশিয়ার’ এবং সিন্ডিকেটের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের দাবি, আর্টসের শিক্ষার্থী হয়েও তোফায়েল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অবৈধভাবে প্রোগ্রামার পদে নিয়োগ পান। তবে নিয়োগের যোগ্যতা, বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ কমিটির সুপারিশ ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথি যাচাই ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তোফায়েলের ছোট ভাই হাবিবুর রহমান ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বুড়িচং উপজেলার আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে নিজ গ্রাম যদুপুরে রাতের বেলায় মদ ও গাঁজার আসর বসাতেন। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি জামায়াত-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় গ্রহণ করেছেন বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নজরুল ইসলামের সঙ্গে তোফায়েলের ঘনিষ্ঠতার কারণে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। তোফায়েল বুড়িচংয়ে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত ছিলেন এবং পরে মামলা থেকে তাঁর নাম বাদ পড়ে—এমন অভিযোগও করা হয়েছে।

শিক্ষা ভবনের কর্মচারী কবির আহমেদের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন : শিক্ষা ভবনের উন্নয়ন প্রকল্পের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে পরিচিত কবির আহমেদের পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুনের সময়ে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কর্মরত তাঁর ভগ্নিপতি ইকবালের সহায়তায় কবির আহমেদ সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হন।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নজরুল ইসলামের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত কবির আহমেদকে নিজ উপজেলা বুড়িচংয়ে পদায়নের জন্য অন্য একজন কর্মকর্তা মান্নানকে অন্যত্র বদলি করা হয়। কবির আহমেদের আত্মীয়স্বজনদেরও বিভিন্ন সুবিধাজনক পদে পদায়ন করানোর অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কবির আহমেদের নিয়োগ ও রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির আদেশ, চাকরির যোগ্যতা, পদ সৃষ্টির অনুমোদন, বদলি-পদায়নের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

তুষারধারায় ২৪ কাঠা জমিতে বহুতল ভবন  : রাজউকের বিধি মানা হয়েছে কি ? নজরুল ইসলামকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের তুষারধারা আবাসিক এলাকার ১০ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত একটি বহুতল ভবন নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সাবেক এই সচিবের সেখানে ২৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত একটি বহুতল ভবন রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনটির নির্মাণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ফার বা ফ্লোর এরিয়া রেশিও (FAR), সেটব্যাকসহ প্রযোজ্য নির্মাণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। রাজউকের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণ অনুমোদনপত্রের শর্ত অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করে অকুপেন্সি সনদ গ্রহণের পর ভবন ব্যবহারের কথা থাকলেও নির্মাণাধীন অবস্থাতেই সেখানে বসবাস শুরু করার অভিযোগ উঠেছে।

এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ভবনটির জমির দলিল, মালিকানা ও অংশীদারত্বের তথ্য, অনুমোদিত নকশা, সংশোধিত নকশা, নির্মাণকাজ পরিদর্শনের প্রতিবেদন, অকুপেন্সি সনদ এবং রাজউকের নথি যাচাই করা জরুরি। প্রশ্ন হলো, একজন সাবেক সচিবের ভবন নির্মাণেই যদি বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের তদারকি করেছে? ভবনটির অনুমোদিত নকশা ও বাস্তব নির্মাণের মধ্যে কোনো অমিল থাকলে তা চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ফ্রেন্ডস ভিউ টাওয়ার: ২০২২ সালে অভিযান, পরে নির্মাণ সম্পন্নের অভিযোগ  :  তুষারধারা আবাসিক এলাকার ৯ নম্বর সেক্টরে বায়তুশ শরীয়ত মসজিদের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ‘ফ্রেন্ডস ভিউ টাওয়ার’ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনটি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে নির্মাণ করা হচ্ছিল। ২০২২ সালে রাজউক সেখানে অভিযান চালিয়ে ভবনের কিছু অংশ ভেঙে দেয় এবং মুচলেকা নিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে নজরুল ইসলাম সচিব হওয়ার পর ভবনটির নির্মাণকাজ আবার সম্পন্ন করা হয় এবং অকুপেন্সি সনদ ছাড়াই সেখানে বসবাস শুরু হয়।

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি,  রাজউকের পূর্ববর্তী অভিযান, মুচলেকা এবং কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ কার্যকর ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ভবনটির বর্তমান অবস্থা, অনুমোদিত নকশা, নির্মাণকাজ পুনরায় শুরুর অনুমতি, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং অকুপেন্সি সনদের তথ্য প্রকাশ করা হলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।

মিশন সাগরিকা এপার্টমেন্ট: দুদকে অভিযোগের পরও পার্কিংয়ে দোকান ও ফ্ল্যাট নির্মাণ ?  তুষারধারা আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সেক্টরের ‘মিশন সাগরিকা এপার্টমেন্ট’ নিয়েও দীর্ঘদিনের বিরোধ ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা ভবনের উন্নয়ন প্রকল্পের কম্পিউটার অপারেটর আবু সেলিম ও মো. শাহাজাহান ২০১৭ সাল থেকে ভবনটির মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ ও নির্মাণ অনিয়ম নিয়ে রাজউক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়ে আসছেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৯ ও ২০২২ সালে দুদকের ৬০ নম্বরে মূল্যায়নকৃত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জরিমানা ও মুচলেকা আদায় করে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান ও ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, একটি ফ্ল্যাট বিক্রির পরই কাগজপত্র পরিবর্তন করে ফেলার কৌশল অবলম্বন করেছে সংশ্লিষ্ট চক্র। তবে এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ নজরদারির মাধ্যমে  ফ্ল্যাট বিক্রির দলিল, নিবন্ধন নথি, অনুমোদিত নকশা, রাজউকের পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং দুদকের অভিযোগের মূল কপি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নজরুল ইসলামকে ঘিরে গড়ে ওঠা বলয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর নির্মাণে অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি অনুসরণের ঘাটতি রয়েছে। তবে প্রতিটি ভবনের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে নথি যাচাই না করে সব ভবনকে একইভাবে অবৈধ ঘোষণা করা যায় না।

যদুপুরের ওমর ফারুককে ধানমন্ডিতে অফিসার্স কোয়ার্টার বরাদ্দের অভিযোগ  :  নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যদুপুর গ্রামের ওমর ফারুক, যিনি অভিযোগ অনুযায়ী পলিটেকনিক্যালের কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট পদে কর্মরত, তাঁকে ধানমন্ডিতে অফিসার্স কোয়ার্টার বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, বরাদ্দটি নিয়মবহির্ভূতভাবে দেওয়া হয়েছিল। সরকারি আবাসন বরাদ্দের ক্ষেত্রে পদ, চাকরির ধরন, প্রাপ্যতা, জ্যেষ্ঠতা এবং প্রযোজ্য নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। বরাদ্দপত্র, আবেদন, যোগ্যতা যাচাইয়ের নথি এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলেই অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।

রফিক-তোফায়েল-মুমিন-হাবিব গং: সম্পদ ও নিয়োগের উৎস অনুসন্ধানের দাবি : অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যদুপুর গ্রামের রফিক, তোফায়েল, মুমিন ও হাবিবকে নজরুল ইসলামের কথিত বলয়ের অন্যতম সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁদের দাবি, প্রায় চার দশক আগে নোয়াখালী থেকে আসা এই পরিবারটি পরবর্তী সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে। তবে সম্পদের পরিমাণ, মালিকানা ও অর্জনের উৎস নির্ধারণে ভূমি নিবন্ধন, আয়কর নথি, কোম্পানির মালিকানা এবং আর্থিক লেনদেন যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মুমিন ঘুষের বিনিময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকের পদ বাগিয়ে নেন এবং অল্প সময়ে আদাবর, উত্তরা, বসুন্ধরা, কুমিল্লা, দৌলতপুর ও বুড়িচংয়ে প্লটসহ স্কুল ও হাসপাতালের মালিক হন। এ অভিযোগের পক্ষে নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি, সম্পদ বিবরণী, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন এবং জমির দলিল পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া মুমিনের আত্মীয় দ্বীন মোহাম্মদের ছেলে সোহেল রানাকে বঙ্গবন্ধু ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেওয়ার নামে ১১ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সিস্টেম অ্যানালিস্ট শাহিনের মাধ্যমে জালিয়াতি করে এ নিয়োগ-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করা হয়।

কাজী মামন: ফ্ল্যাটের মালিকানা ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ :  অভিযোগে কাজী মামনের নামও এসেছে। তিনি খিলক্ষেতের স্টক এক্সচেঞ্জে চাকরি করলেও সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে থাকা বলয়ের সহায়তায় একাধিক ভবনের ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, মামন নিজেকে নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করে ছবি দেখিয়ে অবৈধ দখল, বদলি-বাণিজ্য ও ঠিকাদারি কাজের তদবির করতেন।

তবে এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ে তাঁর সম্পদ অর্জনের উৎস, সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটের দলিল, চাকরির আয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং কথিত তদবিরের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের ব্যানারে সম্পদ গড়ার অভিযোগ : অভিযোগকারীরা নজরুল ইসলামকে ঘিরে থাকা বলয়ের সঙ্গে নিম্নোক্ত প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোর নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি ডেভেলপার কার্যক্রম, সম্পদ অর্জন, ভবন নির্মাণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কনটেক ডেভেলপার, ওয়নল্যান্ড ডেভেলপার, কনফিডেন্স গ্রুপ, রোজ গার্ডেন এসোসিয়েশন, মিশন ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট, বুড়িচং পলিটেকনিক, বুড়িচং আধুনিক হাসপাতাল, বুড়িচং ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, রওশন-সিরাজ ফাউন্ডেশন, মিশন শ্যামলিমা, মিশন লাইট হাউজ, মিশন গার্ডেন ঢাকা এবং কনফিডেন্স সফটওয়ার।

অভিযোগকারীদের দাবি, বুড়িচং ওয়েলফেয়ার সোসাইটি তুষারধারা আবাসিক এলাকার একটি ঠিকানা ব্যবহার করে দীর্ঘদিন আড়ালে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এ ছাড়া কথিত ভুয়া ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের নামে ভবন নির্মাণ, কাগজপত্রে অসংগতি এবং ফ্ল্যাট বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।

তালিকাভুক্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ একই ধরনের নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভুয়া, অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তার নিবন্ধন, পরিচালনা পর্ষদ, প্রকৃত মালিকানা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, কর-সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ভবনের অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন।

সম্পদ বিবরণী, ভবনের নকশা ও আর্থিক লেনদেন তদন্তের দাবি : অভিযোগকারীদের দাবি, কথিত বলয়ের সদস্যদের ঢাকা, কুমিল্লা ও বুড়িচংয়ে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ, ফ্ল্যাট বিক্রির সময় কাগজপত্র পরিবর্তন এবং সাধারণ ক্রেতাদের অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিধি প্রয়োগ, আবাসন খাতে ক্রেতাদের অধিকার এবং সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি পালনের বিষয়ও জড়িত হতে পারে।

তাই সম্পদ অর্জনের উৎস, আয়কর রিটার্ন, আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য, কোম্পানির শেয়ার ও পরিচালনা পর্ষদে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান, জমির দলিল এবং ফ্ল্যাট বিক্রির নথি সমন্বিতভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ  : সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন অভিযোগকারীরা । একই সঙ্গে রাজউকের অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা ভবনগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

এ ক্ষেত্রে করণীয় হতে পারে— সাবেক সচিব নজরুল ইসলামের পদোন্নতি-সংক্রান্ত আদেশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি যাচাই। তুষারধারার ১০ নম্বর সেক্টরের ২৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ভবন, ফ্রেন্ডস ভিউ টাওয়ার এবং মিশন সাগরিকা এপার্টমেন্টের অনুমোদিত নকশা, বাস্তব নির্মাণ, অকুপেন্সি সনদ ও রাজউকের পরিদর্শন প্রতিবেদন পরীক্ষা।

২০২২ সালের রাজউক অভিযানের পর ফ্রেন্ডস ভিউ টাওয়ারে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হয়ে থাকলে তার অনুমোদন ও আইনগত ভিত্তি যাচাই। মিশন সাগরিকা এপার্টমেন্ট নিয়ে ২০১৭, ২০১৯ ও ২০২২ সালের অভিযোগ, জরিমানা, মুচলেকা এবং নির্মাণ বন্ধ রাখার নির্দেশসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা। কবির আহমেদের নিয়োগ, রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তি ও বদলি-পদায়নের বৈধতা যাচাই। ওমর ফারুকের ধানমন্ডির অফিসার্স কোয়ার্টার বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা। তালিকাভুক্ত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোর নিবন্ধন, প্রকৃত মালিকানা, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর নির্মাণ অনুমোদন যাচাই। অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের উৎস এবং সরকারি আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া।
প্রমাণিত অনিয়মের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক, দেওয়ানি বা ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের অভিযোগ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া।

জবাবদিহি নিশ্চিত হোক, নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসুক প্রকৃত চিত্র :   একজন সরকারি কর্মকর্তার পদোন্নতি, সম্পদ অর্জন কিংবা ব্যক্তিগতভাবে কোনো ভবনের মালিক হওয়া নিজে থেকেই অপরাধের প্রমাণ নয়। কিন্তু সরকারি পদে থেকে প্রভাব খাটানো, বিধিবহির্ভূত নির্মাণে সহায়তা, অবৈধ সম্পদ অর্জন কিংবা নিয়োগ ও বদলি-পদায়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। অভিযোগকারীদের বক্তব্যের পাশাপাশি সরকারি নথি, রাজউকের অনুমোদন, সম্পদ বিবরণী, নিয়োগ ও পদোন্নতির আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের কাছে এখন প্রধান প্রশ্ন—সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি? তুষারধারাসহ সংশ্লিষ্ট আবাসিক এলাকার ভবনগুলোর নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি? আর তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ অর্জনের উৎস অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হবে কি ? জনস্বার্থে এসব প্রশ্নের নথিভিত্তিক উত্তর ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন অভিযোগকারীরা।

👁️ 53 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *