!! ফলোআপ !! ঢাকা নগর গণপূর্তে ‘অদৃশ্য শক্তিধর নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল কি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রনালেয়ের জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে  ? 

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সংগঠন সংবাদ সারাদেশ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের “সুপারম্যান” ক্ষ্যাত প্রভাবশালী নির্বাহী প্রকৌশলীস্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল।


বিজ্ঞাপন

 

নিজস্ব প্রতিবেদক :  সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই জেলায় দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। নিয়মিত বদলি, পদায়ন ও রোটেশনই প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অন্যতম শর্ত। কিন্তু গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের সদ্য বদলিকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল যেন এই নিয়মের বাইরে এক ব্যতিক্রমী নাম।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে তিনি চাকরি জীবনের শুরু থেকেই ঢাকা কেন্দ্রিক লোভনীয় পদে বহাল থেকেছেন। প্রতি বছর যেখানে শতাধিক প্রকৌশলীকে দেশের বিভিন্ন জেলায় বদলি করা হয়, সেখানে অজ্ঞাত কারণে তার বদলি হয়নি বছরের পর বছর। প্রশ্ন উঠছে—কোন অদৃশ্য শক্তি তাকে এতদিন ঢাকায় আগলে রেখেছিল?


বিজ্ঞাপন

মন্ত্রী–সচিব ঘনিষ্ঠতা, দলীয় লবিং ও সুবিধাজনক পদায়নের অভিযোগ : সূত্র জানায়, ২০০৪ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগদানের পরপরই প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর সুপারিশে তিনি ঢাকায় পোস্টিং পান। পরবর্তীতে দলীয় লবিং ও প্রশাসনের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে একের পর এক লোভনীয় পদ বাগিয়ে নেন। বিশেষ করে সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার দায়িত্বে থাকাকালে স্বর্ণেন্দু শেখরকে প্রায়ই সচিবালয়ে অবস্থান করতে দেখা যেত। তাকে নিজ অফিসে পাওয়া যেত না বললেই চলে। সচিবের ‘একান্ত লোক’ হিসেবে তার পরিচিতি ছিল প্রশাসনে আলোচিত।


বিজ্ঞাপন

টেন্ডার বাণিজ্য, ভুয়া বিল ও কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ : সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, মেরামত ও উন্নয়ন কাজে বাস্তবে কাজ না করেই খাতা-কলমে প্রকল্প সম্পন্ন দেখিয়ে বরাদ্দের অর্থ ভাগাভাগির চুক্তিতে আত্মসাৎ করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩০ কোটি টাকা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দের দ্বিগুণের বেশি টেন্ডার আহ্বান করে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে। গত কয়েক অর্থবছরের টেন্ডার ফাইল ও বিল ভাউচার নিরীক্ষা করলে অনিয়মের প্রমাণ মিলবে বলে একাধিক ঠিকাদার দাবি করেছেন।

বদলি বাণিজ্য ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক ? : গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর ভাষ্যমতে, স্বর্ণেন্দু শেখর বদলি ও পদায়নে প্রভাব খাটিয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। বড় বড় ঠিকাদারদের নিয়ে তৈরি করেন সিন্ডিকেট, যেখানে কমিশনের বিনিময়ে কাজ বণ্টন হতো।

তিনি সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ঘনিষ্ঠ এবং আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীম সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিদেশে অর্থ পাচার ও ভারতে সম্পদের সন্ধান  : নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতে বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যদি তার ও পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্র ভিত্তিক সম্পদ অনুসন্ধান করে, তবে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের সন্ধান মিলতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন।

র’-এর পরিচয় দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ : আর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে—স্বর্ণেন্দু শেখর তার ঘনিষ্ঠ মহলে নিজেকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দিতেন এবং এ পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসন ও ব্যবসায়িক মহলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ও করেছেন। যদিও এ বিষয়ে কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থার আনুষ্ঠানিক কোন প্রকার  বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার বলয় : জানা গেছে, তার মরহুম পিতা খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার গড়াইখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। দলীয় পরিচয়ের সুবাদে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি প্রশাসনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

হঠাৎ বদলি, নতুন ষড়যন্ত্রের অভিযোগ : গত ৫ আগস্টে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলন সংগ্রামের ফলে সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংবাদমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ হলে অবশেষে তাকে ঢাকার বাইরে গোপালগঞ্জে বদলি করা হয়।

তবে অভিযোগ উঠেছে—সেখানে গিয়েও তিনি পূর্বের সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্রের রূপরেখা তৈরির চেষ্টা করছেন।

আইন কী বলে ? :  গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন— “সরকারি সার্ভিস রুলস অনুযায়ী একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই জেলা বা বিভাগে কর্মরত থাকতে পারেন না। নিয়ম ভঙ্গ হলে বিভাগীয় শাস্তি এমনকি চাকরিচ্যুতির বিধান রয়েছে।”

প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগের চেষ্টা : এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

শেষ প্রশ্ন : একজন সরকারি প্রকৌশলী কীভাবে দীর্ঘ দুই দশক ধরে বদলির বাইরে থাকেন? কীভাবে সীমাহীন টেন্ডার, ভুয়া বিল ও কমিশন বাণিজ্য চলতে পারে? আর কোটি কোটি টাকা কোথায় গেল? এখন দৃষ্টি দুদক ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার দিকে। স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল কি সত্যিই ‘অদৃশ্য ছত্রছায়ার’ প্রকৌশলী, নাকি এবার শুরু হবে জবাবদিহিতার অধ্যায়?

👁️ 71 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *