রাজউকের জোন–২-এ ‘অদৃশ্য সাম্রাজ্য’ : পরিচালক মোবারক হোসেনকে ঘিরে কোটি কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগে তোলপাড় !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক :  রাজধানীর উন্নয়ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)—যে প্রতিষ্ঠানের হাতে ঢাকার নগর পরিকল্পনা ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব—সেই প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঘিরে আবারও তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

জোন–২-এর পরিচালক মোবারক হোসেনকে ঘিরে উঠেছে কোটি কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, ঘুষের নেটওয়ার্ক এবং রহস্যজনকভাবে থেমে যাওয়া তদন্তের প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকদের অভিযোগ—রাজউকে কাজ করাতে হলে নিয়মের পাশাপাশি চলে ‘চলতি টাকা’র অদৃশ্য শর্ত। সেই বহুল আলোচিত অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার সরাসরি উঠে এসেছে এই কর্মকর্তার নাম।

ঘুষ ছাড়া কাজ এগোয় না—নাগরিকদের ক্ষোভ  : ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন, প্লটের কাগজপত্র যাচাই কিংবা বিভিন্ন উন্নয়ন অনুমোদন—এসব সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের দীর্ঘদিন ধরেই নানা জটিলতা ও ধীরগতির মুখে পড়তে হয়।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগকারীদের দাবি, এই জটিলতার আড়ালেই তৈরি হয়েছে ঘুষের এক শক্তিশালী অদৃশ্য শৃঙ্খল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জোন–২-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা পরিচালক মোবারক


বিজ্ঞাপন

হোসেনের নির্দেশ ছাড়া অনেক ফাইলই নড়ে না। আর কাজ দ্রুত করতে চাইলে নির্দিষ্ট কিছু মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের চাপ তৈরি করা হয়—এমন অভিযোগও করছেন সেবা নিতে যাওয়া অনেকেই।

উত্তরায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট—মূল্য ১৮ কোটি করে  : অভিযোগের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় তাঁর সম্পদের বিষয়টি। অভিযোগকারীদের দাবি— উত্তরা সেক্টর–১৩-এ মোবারক হোসেনের নামে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে , প্রতিটির বাজারমূল্য ১৮ কোটি টাকারও বেশি। শুধু তাই নয়, একই এলাকায় আরেকটি ফ্ল্যাট তাঁর ব্যবহারাধীন রয়েছে বলেও দাবি উঠেছে।

স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব ফ্ল্যাট আধুনিক নকশা ও ব্যয়বহুল নির্মাণসামগ্রী দিয়ে নির্মিত।, কিন্তু একজন সরকারি কর্মকর্তার আয় দিয়ে এত বড় বিনিয়োগের অর্থের উৎস কী—সে প্রশ্নের কোনো সরকারি তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

উত্তরা সেক্টর–১৫-এ কোটি টাকার প্লট  : অভিযোগকারীদের দাবি, উত্তরা সেক্টর–১৫ এলাকাতেও জমি কিনেছেন মোবারক হোসেন।

তাদের তথ্য অনুযায়ী— সেক্টরের ৩ নম্বর রোডে তিন কাঠার একটি প্লট কেনা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকায়, একই এলাকায় মেইন রোডসংলগ্ন আরেকটি প্লট কেনা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায়। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, এই পরিমাণ অর্থ একজন সরকারি কর্মকর্তার বেতনের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

পাবনায় জমির পাহাড়  ?  রাজধানীর বাইরে পাবনার হাটগ্রাম মৌজাতেও তাঁর নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে সেখানে একাধিক খণ্ড জমি কেনা হয়েছে, যার সম্মিলিত বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকার মধ্যে।

অভিযোগকারীদের ধারণা, এসব সম্পদের বড় অংশই সরকারি পদ ব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে অর্জিত হয়ে থাকতে পারে।

কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি : মোবারক হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর নামে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি থাকার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গাড়িগুলোর মূল্য কয়েক কোটি টাকা। এ ধরনের গাড়ি সাধারণত বড় ব্যবসায়ী বা উচ্চবিত্ত উদ্যোক্তাদের মধ্যেই বেশি দেখা যায় বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুদকের অনুসন্ধান—হঠাৎ থেমে যাওয়ার অভিযোগ  : সবচেয়ে রহস্যজনক প্রশ্নটি উঠেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর অনুসন্ধান নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি— ২০২৩ সালে দুদক মোবারক হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিল।

কিছু তথ্য সংগ্রহের পর হঠাৎ করেই সেই অনুসন্ধানের অগ্রগতি থেমে যায়। তাদের মতে, কোনো প্রভাবশালী মহলের চাপেই তদন্ত স্থগিত হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজউকের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন : এই অভিযোগ সামনে আসার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে রাজউকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে। রাজউকের ভেতরে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন বিভাগে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম ও ‘চলতি টাকা’র সংস্কৃতি রয়েছে। তাদের মতে, মোবারক হোসেনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো পুরোনো সমস্যারই আরেকটি প্রতিফলন হতে পারে।

এখনো প্রমাণ হয়নি অভিযোগ, তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এ পর্যন্ত মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। তিনি নিজেও এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

বিশেষজ্ঞদের মতে,  একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি চাইলে— তাঁর সম্পদ বিবরণী, কর রিটার্ন এবং ব্যাংক লেনদেনের নথি প্রকাশ করতে পারেন। এতে জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহ অনেকটাই দূর হতে পারে।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি : নাগরিক সমাজ ও স্বচ্ছতা–পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলোর দাবি, অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে দ্রুত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্ত হলে হয় অভিযোগ প্রমাণিত হবে, নয়তো পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

কিন্তু তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে এমন—
অভিযোগ যেমন প্রমাণিত নয়, তেমনি পুরোপুরি অস্বীকারও করা যাচ্ছে না। ফলে রাজউকের এই কর্মকর্তাকে ঘিরে বিতর্ক, গুঞ্জন ও প্রশ্নের ঝড় থামছেই না।

পরবর্তী সংখ্যায় : দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে বিতর্কের কারণ কী? মোবারক হোসেনের দীর্ঘ নীরবতা কেন প্রশ্নবিদ্ধ—চলছে অনুসন্ধান।

👁️ 64 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *