
নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তর—যে প্রতিষ্ঠান দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই যদি জন্ম নেয় দুর্নীতির “সুপার সিন্ডিকেট”, তবে রাষ্ট্রের অর্থ লুট হওয়াটা আর অবাক করার মতো কিছু থাকে না।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রী ঠিক এমনই এক আলোচিত নাম। ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য, অনিয়ম–দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং অফিসের ভেতরেই অনৈতিক সম্পর্ক—সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক বিস্ফোরক বিতর্ক।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের হওয়া এক অভিযোগে বলা হয়েছে—অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন এই কর্মকর্তা।

গণপূর্তে “মিস্ত্রী সিন্ডিকেট” : অভিযোগ অনুযায়ী, গণপূর্ত অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রী, তার আপন ভাই উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিঠুন মিস্ত্রী এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসী মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।

এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে দুদকে। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জনস্বার্থে দায়ের হওয়া অভিযোগে বলা হয়, সমীরণ মিস্ত্রীর নামে ঢাকায় রয়েছে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও বিলাসবহুল গাড়ি। শুধু রাজধানীতেই নয়— গ্রামের বাড়িতে রয়েছে আড়ম্বরপূর্ণ বাংলো ও খামারবাড়ি। এতেই শেষ নয়।
ভারতে সম্পদের পাহাড় : অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সমীরণ মিস্ত্রী ও তার ভাই মিঠুন মিস্ত্রী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাড়ি কিনেছেন এবং কলকাতায় ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা মানিলন্ডারিং করে ভারতে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর, যা তার সরকারি আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে—সমীরণ মিস্ত্রী, মিঠুন মিস্ত্রী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের অনুসন্ধান করলে পুরো চিত্র পরিষ্কার হয়ে যাবে।
আয়কর ফাইলে সম্পদ গোপন : অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সমীরণ মিস্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যরা তাদের বৈধ–অবৈধ সম্পদের প্রকৃত তথ্য আয়কর ফাইলে গোপন করে নিয়মিত আয়কর ফাঁকি দিচ্ছেন। সরকারি চাকরির সীমিত আয়ে এত বিপুল সম্পদ অর্জন করা সম্ভব নয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
টেন্ডার বাণিজ্যে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ : গণপূর্তের বিভিন্ন টেন্ডার ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় সমীরণ মিস্ত্রীর সরাসরি প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ পাইয়ে দেওয়া, আত্মীয়দের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ঠিকাদারি করা এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ—সবই ছিল এই সিন্ডিকেটের নিয়মিত কর্মকাণ্ড। এই দুর্নীতির কর্মকাণ্ডে তার বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসী।
পরকীয়া কেলেঙ্কারি ও অফিসে অস্বাভাবিক সম্পর্ক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে সমীরণ মিস্ত্রী ও উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীর “অস্বাভাবিক সম্পর্ক”। অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন একই বিভাগে কর্মরত থাকার সুবাদে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
ব্যক্তিগত এই সম্পর্কের জেরেই দপ্তরের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি তাদের একসঙ্গে ভারত সফরের ঘটনাও দপ্তরের ভেতরে-বাইরে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে।
“জাতীয় সংসদের টাকাখেকো ইঞ্জিন” : গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেল–৩-এর অধীন ই/এম বিভাগ–৭ (জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা)-এ প্রায় সাত বছর দায়িত্ব পালন করেন সমীরণ মিস্ত্রী।
এই সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন “জাতীয় সংসদের “টাকাখেকো ইঞ্জিন”—এমন অভিযোগ রয়েছে। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ছিলেন ক্ষমতাবানদের ঘনিষ্ঠ একজন কর্মকর্তা।
আমব্রেলা প্রজেক্টে শত কোটি টাকার লুট : সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে তথাকথিত “আমব্রেলা প্রজেক্ট” ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে ৩০ থেকে ৪০টি দরপত্রের মাধ্যমে অঙ্গভিত্তিক প্রকল্প দেখিয়ে প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো— এই প্রকল্পগুলোর কার্যাদেশ প্রদানকারী কর্মকর্তা ছিলেন স্বয়ং সমীরণ মিস্ত্রী। অর্থাৎ পরিকল্পনা, অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন—সবকিছুই ছিল তার একক নিয়ন্ত্রণে।
ক্ষমতার ছত্রছায়ায় দীর্ঘ ৭ বছর : গত ১ সেপ্টেম্বর সমীরণ মিস্ত্রীকে ইএম বিভাগ–৭ থেকে পিএন্ডডি বিভাগ–১-এ বদলি করা হয়।একই সময়ে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীকেও সেখানে বদলি করা হয়, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এর আগে প্রায় ৭ বছর ধরে গণপূর্তের সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস ডিভিশনে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, পরে গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার এবং গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদকে ব্যবহার করে নিয়ম বহির্ভূতভাবে একই বিভাগে নিজের পোস্টিং ধরে রেখেছিলেন। কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দপ্তরে অদক্ষতা ও বিতর্ক : ইএম বিভাগ–৭ এর অধীনে প্লানিং কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন সিফাত ওয়াসী।
কিন্তু দায়িত্ব পালনে চরম অদক্ষতা ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধেও। অভিযোগ অনুযায়ী, পুরো সময়জুড়ে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রীর ছায়াসঙ্গী হিসেবেই কাজ করেছেন।
অভিযোগের পরও রহস্যজনক নীরবতা : সব অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত সমীরণ মিস্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—গণপূর্ত অধিদপ্তরে কি দুর্নীতিবাজদের জন্য আলাদা সুরক্ষা বলয় তৈরি হয়েছে?
যোগাযোগে ব্যর্থ : অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিঠুন মিস্ত্রী এবং সিফাত ওয়াসীর সঙ্গে একাধিকবার টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগপত্রসহ বার্তা পাঠানো হলে তারা কোনো জবাব না দিয়ে প্রতিবেদককে ব্লক করে দেন।
দুদকের তদন্ত দাবি : দুদকে দায়ের হওয়া আবেদনে সমীরণ মিস্ত্রী, মিঠুন মিস্ত্রী ও সিফাত ওয়াসীর বিরুদ্ধে— জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ, মানিলন্ডারিং, আয়কর ফাঁকি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জন্য কাজ করছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক।
