চট্টগ্রাম বন্দরে ফ্যাসিস্ট সিন্ডিকেটের অদৃশ্য সাম্রাজ্যে পলাতক সিবিএ নেতা ফটিকের ছায়া : জড়িত কর্মকর্তা–শ্রমিক নেতা—ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সাইফ পাওয়ারটেক ইস্যুতে কোটি টাকার দরকষাকষির অভিযোগ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত চট্টগ্রাম জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :  দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। কিন্তু সেই বন্দরেই দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট—যার নেতৃত্বে আছেন পলাতক সিবিএ নেতা নায়েবুল ইসলাম ফটিক। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত কিছু কর্মকর্তা, শ্রমিক নেতা ও ঠিকাদার। ক্ষমতার পালাবদলের পরও তাদের দাপট কমেনি; বরং নতুন রাজনৈতিক ব্যানারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে তারা।


বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—বন্দরের পরিবহন বিভাগের পরিচালক এনামুল করিম, শ্রমিক নেতা শেখ নূরুল্লাহ বাহার, ইব্রাহিম খোকনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদার মিলে বন্দরের টেন্ডার, নিয়োগ, স্ক্র্যাপ ব্যবসা, বার্থ অপারেশনসহ নানা খাতে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।

পলাতক ফটিকের নিয়ন্ত্রণে বন্দর  !  সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরের নিম্নমান বহিঃসহকারী পদে কর্মরত থাকলেও সিবিএ নেতা নায়েবুল ইসলাম ফটিক দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, স্ক্র্যাপ বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে থাকলেও তার ব্যবসা ও প্রভাব চালাচ্ছেন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইব্রাহিম খোকন। ফটিক ও খোকনের গ্রামের বাড়ি ফেনীতে; তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি করেছেন একাধিক সূত্র।


বিজ্ঞাপন

ফটিকের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বন্দর এলাকায় রক্সি কনস্ট্রাকশন, সাগর মোটর্স, মমতাজ এন্ড সন্স এবং আইটি এন্টারপ্রাইজ নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার কাজ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিচালক এনামুল করিমকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ  : অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পরিবহন বিভাগের পরিচালক এনামুল করিম এই সিন্ডিকেটের অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রের দাবি— তিনি একদিকে সাইফ পাওয়ারটেকের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন অন্যদিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে দরকষাকষির অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি বন্দরের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৯ জুন অবসরে যাওয়ার পর ডিপি ওয়ার্ল্ডে বড় পদে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এই কর্মকর্তার।

অভিযোগ রয়েছে, এনামুল করিমের নামে-বেনামে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও লক্ষীপুরে বিপুল সম্পদ রয়েছে। পাশাপাশি তিনি একাধিক শিপিং কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বলেও দাবি করা হয়েছে।

সাইফ পাওয়ারটেক বনাম ডিপি ওয়ার্ল্ড: আন্দোলনের আড়ালে অর্থ বাণিজ্য  ?  চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) পরিচালনা নিয়ে বিদেশি কোম্পানি DP World-এর সঙ্গে সরকারের সম্ভাব্য চুক্তি ঘিরে সম্প্রতি শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে— শ্রমিক নেতা শেখ নূরুল্লাহ বাহার, ইব্রাহিম খোকন, এবং হুমায়ুন কবির আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও এর পেছনে অর্থায়ন করেছে বন্দর অপারেটর প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক—এমন অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রের দাবি, এই আন্দোলন দীর্ঘায়িত করে বন্দরের কার্যক্রম প্রায় ১০ দিন অচল করে দেওয়া হয়, যার ফলে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

তবে এখন সিন্ডিকেট বুঝতে পেরেছে যে চুক্তি ঠেকানো সম্ভব নয়। তাই আন্দোলন দেখিয়ে উভয় পক্ষ থেকেই অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

১৮ মাস অনুপস্থিত থেকেও চাকরিতে ফটিক !  সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী ৬০ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকলে চাকরি বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে—প্রায় ১৮ মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও ফটিক এখনো চাকরিতে বহাল।

বন্দরের প্রশাসন বিভাগ একাধিকবার এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তাগাদা দিলেও পরিচালক এনামুল করিম তা এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাবেক চেয়ারম্যান সোহায়েলের ঘনিষ্ঠ ফটিককে চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল-এর ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়।

দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে সোহায়েল বর্তমানে কারাবন্দি। তবে অভিযোগ রয়েছে, তার সময়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়।

 

দুদকের নজরদারিতে সিন্ডিকেট : ফটিকসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করেছে। তাদের সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে তদন্ত চললেও এখনো দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি বন্দরের একাধিক কর্মচারীর।

দুদক মামুন’ ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ : বন্দরের এক কর্মচারী আব্দুল্লাহ আল মামুন, যিনি কর্মচারীদের কাছে “দুদক মামুন” নামে পরিচিত—তার বিরুদ্ধেও প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, মামুন ও তার সহযোগী সরোয়ার হোসেন লাভলু নিয়োগ শাখার মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত।

আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি—রূপ বদলানোর অভিযোগ :
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, বন্দরের কয়েকজন কর্মচারী আওয়ামী লীগ আমলে ক্ষমতার কেন্দ্রের ঘনিষ্ঠ থাকলেও বর্তমানে বিএনপির ব্যানারে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন।

এদের মধ্যে রয়েছেন— ফরিদুর রহমান, সরোয়ার হোসেন লাভলু, শাকিল রায়হান, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মানিক মিঝি, মনির উদ্দিন বাপ্পীসহ আরও কয়েকজন। অভিযোগ রয়েছে, তারা নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বন্দরে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

অদৃশ্য শক্তির দখলে দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র  : বন্দর সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। তাদের প্রভাবের কারণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন— “বন্দরে একটি অদৃশ্য শক্তি কাজ করে। তারা কর্মকর্তা বদলি থেকে টেন্ডার পর্যন্ত সবকিছুতে প্রভাব খাটায়।”

তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা দাবি : বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে যদি এই ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে, তবে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তারা মনে করেন—দুর্নীতি, সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে বন্দরের প্রশাসন পুনর্গঠন না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

👁️ 108 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *