গণপূর্তে দুর্নীতির অদৃশ্য সাম্রাজ্যে  :  আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রের আশ্রয়ে ইলেকট্রনিক সার্কেলে কোটি কোটি টাকা লোপাটের  ভয়ংকর নকশা

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :  গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি)—এক সময় রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বাস্তবায়নের প্রতীকী প্রতিষ্ঠান হলেও, আজ তা পরিণত হয়েছে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রের অবৈধ অর্থ সংগ্রহের নিরাপদ কারখানায়। চাকরিতে যোগ দেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হওয়া এখানে যেন অলিখিত নিয়ম।


বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য বলছে—এটি আর গুজব নয়; বরং নথি, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও অডিট রিপোর্টে প্রমাণিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কাঠামো।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে ‘নিরাপত্তা’র নামে ভুয়া প্রকল্প, : অভিযোগের কেন্দ্রে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রনিক/মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল–ঢাকা-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেন (কিছু নথিতে আলমগীর খান)। অভিযোগ অনুযায়ী, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় তথাকথিত নিরাপত্তা জোরদারের নামে একটি সিসি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।


বিজ্ঞাপন

কাগজে-কলমে প্রকল্পের চিত্র :  ৩টি, ১৬-চ্যানেল ডিভিআর
১২টি পিটিজেড (PTZ) সিসি ক্যামেরা, ১০টি ডে-নাইট ভিশন ক্যামেরা, ৩টি ডিসপ্লে মনিটরসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা: অনুসন্ধানে দেখা যায়— একাধিক ক্যামেরা অচল, কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহার অনুপযোগী কোথাও কোথাও ক্যামেরা বসানোই হয়নি অথচ এসব গুরুতর ঘাটতি উপেক্ষা করে প্রকল্পটি “সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত” দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়।


বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সরকারি আর্থিক বিধিমালা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে।

পিপিআর লঙ্ঘনের নগ্ন প্রদর্শনী   : মাত্র দুই দিনে তিন কার্যাদেশ
নথি পর্যালোচনায় উঠে এসেছে আরও ভয়ংকর তথ্য। উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর— স্মারক নং ৩৫০২ (১৪ জুন ২০১৬)
স্মারক নং ৩৫০৭ (১৫ জুন ২০১৬) স্মারক নং ৩৫০৮ (১৫ জুন ২০১৬) এই তিনটি স্মারকের মাধ্যমে মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে একই ঠিকাদারকে তিনটি কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর)–এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যেখানে প্রতিযোগিতা ধ্বংস করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে বেআইনিভাবে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সূত্রের দাবি, এসব কার্যাদেশ অনুমোদন ও বিল ছাড়ের পেছনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেনের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও নির্দেশনা ছিল।

অডিটে ধরা, তবু ব্যবস্থা নেই—নীরবতার রহস্য কোথায় ?
চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো— ২০১৬–১৭ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে এসব অনিয়ম স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে অধিদপ্তরের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে— এত বড় দুর্নীতির পরও অভিযুক্ত কর্মকর্তা কীভাবে বহাল তবিয়তে আছেন ? এই প্রশ্নই এখন পরিণত হয়েছে রাষ্ট্রীয় রহস্যে।

সম্পদের পাহাড় ও অর্থ পাচারের অভিযোগ  : ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, ঘুষ ও দুর্নীতির অর্থে মো. আলমগীর হোসেন ঢাকাসহ আশপাশে একাধিক বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্লট ক্রয় করেছেন। পাশাপাশি বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরেই পিডব্লিউডির ই/এম ঢাকা জোনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পরিচালিত দুর্নীতির বলয়, যেখানে কিছু কর্মকর্তা বছরের পর বছর জবাবদিহির বাইরে থেকে গেছেন।

সাংবাদিক হুমকি ও ক্ষমতার দম্ভ :  অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি হুমকিমূলক আচরণ করেন আলমগীর হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রকাশ্যে বলেন— “আমার বিরুদ্ধে লেখালেখি করলে পরিণাম হবে ভয়াবহ… কাউকে ভয় পাই না।” এই বক্তব্য সাংবাদিক মহলে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

টিআইবি’র স্পষ্ট অবস্থান  :  ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন— “সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের স্বার্থ রক্ষা করা হলে সাধারণ ঠিকাদাররা বঞ্চিত হন। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া বা ভুয়া প্রকল্প দেখানো—এসবই সরাসরি দুর্নীতি। অডিট রিপোর্ট থাকার পরও ব্যবস্থা না নেওয়াটা গুরুতর প্রশ্ন।”

শেষ প্রশ্ন—দুদক কি আদৌ নড়বে ?  সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়— অডিট রিপোর্ট থাকার পরও কেন ব্যবস্থা নেই ? হুমকি দেওয়া একজন কর্মকর্তা কীভাবে এখনও ক্ষমতার কেন্দ্রে ?

দুদক কবে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে ? রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের এই অভিযোগ কি সত্যিই তদন্তের আলো দেখবে, নাকি আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রের ছত্রছায়ায় সবকিছু আবারও চাপা পড়ে যাবে—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

👁️ 73 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *