
মোঃ সাইফুর রশিদ চৌধুরী : দেশের মননশীল ও সৃজনশীল সাহিত্যের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই পুরস্কারের মনোনয়ন ও চূড়ান্ত তালিকা নিয়ে যে নাটকীয়তা দেখা দিয়েছে, তাতে প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও গাম্ভীর্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সাহিত্য মহলে। বিশেষ করে কবি মোহন রায়হানকে ঘিরে যে ‘লুকোচুরি’ খেলা চলল, তা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।

সূত্রের খবর, এ বছরের কবিতা বিভাগে পুরস্কারের জন্য প্রাথমিকভাবে মোহন রায়হানের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের ঠিক আগ মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে তার নাম বাদ দেওয়া হয়। একাডেমির ভেতরে-বাইরে এখন প্রশ্ন—যদি তিনি যোগ্যই হন, তবে কেন বাদ পড়লেন? আর যদি অযোগ্য হন, তবে নাম উঠলই বা কেন? এই দ্বিধাগ্রস্ত সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলী এবং একাডেমি প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল স্পষ্ট।
পুরস্কারের তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রসঙ্গে কবি মোহন রায়হান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুখ খুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, প্রায় ৪০ বছর আগে কর্নেল তাহেরকে নিয়ে কবিতা লেখার কারণে একটি ‘কুচক্রী মহল’ প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে তার নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন।

তার এই বিস্ফোরক মন্তব্য পুরো ঘটনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন ভিন্ন। মোহন রায়হান মূলত আশির দশকের কবি হিসেবে পরিচিত হলেও ‘বিশুদ্ধ সাহিত্যমান’ বিচারে তিনি কতটা সফল, তা নিয়ে বোদ্ধা মহলে দীর্ঘদিনের সংশয় রয়েছে।

সমালোচকদের মতে, তার লেখায় নান্দনিকতার চেয়ে শ্লোগানধর্মী প্রবণতা বেশি। তার এমন কোনো কবিতা কি আছে যা কালোত্তীর্ণ বা যা বাংলা সাহিত্যের বাঁক বদলে বড় কোনো ভূমিকা রেখেছে? অভিযোগ উঠেছে, সাহিত্যিক মানের চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণেই তার নাম তালিকায় এসেছিল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠায় একাডেমি কর্তৃপক্ষ পিছু হটতে বাধ্য হয়।
একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যখন একবার নাম চূড়ান্ত করার পর আবার তা প্রত্যাহার করে, তখন তার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে গিয়ে ঠেকে। নাম বাদ পড়ার কারণ হিসেবে একাডেমি থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এই অস্পষ্টতা ইঙ্গিত দেয় যে, হয়তো কোনো অদৃশ্য চাপের মুখে যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে, অথবা অযোগ্য কাউকে তোষণ করতে গিয়ে সমালোচনার মুখে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই বাংলা একাডেমির মতো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ কবি ও সমালোচকদের মতে, বাংলা একাডেমি পুরস্কার এখন আর কেবল মেধার মাপকাঠি নয়, বরং লবিং আর গ্রুপিংয়ের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। মোহন রায়হানের মতো বিতর্কিত অন্তর্ভুক্তি এবং পরবর্তীতে তার বাদ পড়া—পুরো প্রক্রিয়াটিকেই হাস্যকর করে তুলেছে।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারকে বিতর্কহীন রাখতে হলে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় শতভাগ পেশাদারিত্ব এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজপথের সক্রিয়তা দিয়ে সাহিত্যের বিচার করা হলে সত্যিকারের গুণী সাহিত্যিকরা কেবল বঞ্চিতই হবেন না, এই পুরস্কারের মর্যাদাও সংকটের মুখে পড়বে।
