কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালকের ‘গোপন’ আবাসন সাম্রাজ্য : বিধিমালা উপেক্ষা করে ফেসবুকে ফ্ল্যাট বিক্রি !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  সরকারি চাকরিজীবী—শব্দটির মধ্যেই রয়েছে শৃঙ্খলা, সংযম ও আইনি বাধ্যবাধকতার এক কঠোর বার্তা। আর তিনি যদি হন দেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক–এর কর্মকর্তা, তাহলে সেই দায়বদ্ধতা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডও প্রযোজ্য। কিন্তু সেই সব বিধিনিষেধকে যেন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্যেই আবাসন ব্যবসায় নেমেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক যুগ্ম পরিচালক দম্পতি—এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।


বিজ্ঞাপন

ভেরিফায়েড পেজে ফ্ল্যাট বিক্রি, নিজেরাই বানালেন ভিডিও বিজ্ঞাপন  :  এ কে এম মাসুম বিল্লাহ—বাংলাদেশ ব্যাংক–এর যুগ্ম পরিচালক। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল–এর সভাপতি। তার স্ত্রী আক্তার জাহান সুখীও একই প্রতিষ্ঠানের যুগ্ম পরিচালক; বর্তমানে ফরেন রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে কর্মরত।

এই দম্পতির আবাসন প্রকল্প ঢাকার মিরপুরের কালশি এলাকায় ১৬৭ শতক জমির ওপর। শুরুতে স্ত্রীর নামে প্রকল্পের নাম ছিল ‘সুখী সিটি’, পরে বড় মেয়ে মাইশার নামে নামকরণ করা হয় ‘মাইশা সিটি’।


বিজ্ঞাপন

মাসুম বিল্লাহ তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে নিয়মিতভাবে এই প্রকল্পের বিজ্ঞাপন প্রচার করেছেন।  গত বছরের ১৭ এপ্রিল দীর্ঘ এক স্ট্যাটাসে ‘কন্ডোমিনিয়াম সুখী সিটি’ প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়—১৬৭ শতক জমির ওপর প্রকল্প বাস্তবায়ন, পশ্চিম পাশে ১২০ ফুট ও দক্ষিণ পাশে ২০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা,  একাধিক ভবন, সামনের ভবনের প্রথম ৫ তলা শপিং মল, উপরের ১০ তলা আবাসিক,  মোট ৩৫০–৩৭৫টি ফ্ল্যাট,  প্রতিটি ফ্ল্যাট ১৬০০ বর্গফুট,  প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত,  পরবর্তীতে ৬ আগস্ট ও ২৪ আগস্ট ‘মাইশা সিটি’ নামে ভিডিও বিজ্ঞাপনচিত্র তৈরি করে একাধিকবার প্রচার করেন। কমেন্ট বক্সে সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন নিয়মিতভাবে।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ গেল গভর্নর ও দুদকে :  এই আবাসন ব্যবসা নিয়ে অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে গত ২৩ জুলাই সরকারের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী লিখিত অভিযোগ দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর–এর কাছে। অভিযোগপত্রের অনুলিপি পাঠানো হয় দুর্নীতি দমন কমিশন–এর চেয়ারম্যানসহ একাধিক দপ্তরে।

অভিযোগে বলা হয়, ১৬৭ শতাংশ জমিতে প্রায় ৪০০ ফ্ল্যাট, শপিংমল নির্মাণ এবং ব্যাংক ঋণের সুবিধার কথা উল্লেখ করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এমনকি বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম ও পদবি ব্যবহার করে আস্থার পরিবেশ তৈরির অভিযোগও ওঠে।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি দুদক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি দিয়ে মাসুম বিল্লাহর পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, কর্মজীবনের বিস্তারিত তথ্য এবং সম্পদের বিবরণ চাওয়া হয়েছে। দুদকের চিঠি আসার পর থেকেই তার ফেসবুক পেজে আর ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে না।

আচরণবিধির স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা  :  সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা–১৯৭৯ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা লাভজনক ব্যবসায়ে যুক্ত হতে পারেন না, যদি না পূর্বানুমোদন থাকে। বিধি ১২: পূর্বানুমোদন ছাড়া আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা যাবে না; নির্মাণ ব্যয়ের উৎস প্রকাশ করতে হবে। বিধি ১৬: কোনো ব্যাংক বা কোম্পানি স্থাপন, নিবন্ধন বা ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করা যাবে না (সমবায় সমিতি ব্যতীত)। বিধি ১৭(ক): সরকারের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া অন্য কোনো ব্যবসা বা চাকরিতে যুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ।

এই বিধানগুলো কার্যকর থাকলেও প্রকাশ্যে আবাসন প্রকল্পের প্রচার ও বিপণন প্রশ্ন তুলেছে—পূর্বানুমোদন ছিল কি না, আর থাকলে তার নথি কোথায়?

রাজনৈতিক প্রভাব ও অস্বাভাবিক তৎপরতা  :  গত ৫ আগস্ট ২০২৪ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাসুম বিল্লাহর আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, তার ভাই আলী আহমেদ বিশ্বাস মাগুরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে।

গত ২০ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল–এর সভাপতি নির্বাচিত হন। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ তলা ভবনের ১৩ তলায় নিজের অফিস কক্ষকে বড় আকারের বৈঠকখানায় রূপ দিয়েছেন। যেখানে সাধারণত অতিরিক্ত পরিচালকের কক্ষে সর্বোচ্চ ৩টি চেয়ার ও একটি সোফাসেট থাকার কথা, সেখানে বসানো হয়েছে ২১টি চেয়ার। দুইজন পিওন সার্বক্ষণিক দায়িত্বে থাকেন।

প্রশ্নের মুখে নীরবতা  :  অভিযোগপত্রের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে দুদক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), মানবসম্পদ বিভাগ ও ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগে। তবু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে এখনো দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ দেখা যায়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে।

প্রশ্ন উঠেছে— কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কীভাবে প্রকাশ্যে আবাসন ব্যবসার প্রচারণা চালান?
পূর্বানুমোদন ছিল কি?  বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে প্রকল্প বিপণন কি শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়?

দুদকের অনুসন্ধান এখন কোন পর্যায়ে—সেটিও স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—যে প্রতিষ্ঠান দেশের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে, সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই যদি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থারও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও স্বচ্ছ জবাবদিহিতা এখন সময়ের দাবি।

👁️ 58 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *