
নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে আবারও ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এবার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একটি বৃহৎ প্রকল্প, যেখানে দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া কর্মসূচির আড়ালে চলেছে কথিত কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগকে ঘিরে ঘুষ লেনদেন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পছন্দের ব্যক্তিদের চাকরি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কৃষিবিদ মো. শফিকুর রহমান। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সাতটি পদে মোট ১৩১ জন জনবল নিয়োগের প্রয়োজন হয়। এ নিয়োগ কার্যক্রম টেন্ডারের মাধ্যমে দেওয়া হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড’-কে। তবে অভিযোগ উঠেছে, নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াই ছিল পূর্বনির্ধারিত এবং অর্থ বাণিজ্যনির্ভর।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে পদভেদে ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। গড়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা হিসাবে ১৩১ জনের কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই বিপুল অর্থের একটি অংশ সরাসরি প্রকল্প পরিচালকের কাছে পৌঁছেছে।

শুধু তাই নয়, প্রকল্প পরিচালকের ব্যক্তিগত পছন্দের অন্তত ১৩ জনকে কোনো ধরনের প্রতিযোগিতা ছাড়াই সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হলেও একটি বিশেষ সিন্ডিকেট সুবিধা পেয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রকল্প পরিচালকের স্বাক্ষরিত ‘নোটিশ অব অ্যাওয়ার্ড’-এর মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই নিয়োগকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কথিত অনিয়ম, তদবির ও আর্থিক লেনদেনের মহোৎসব।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “নিয়োগ কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অধীনে হয়েছে।”
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—যদি পুরো প্রক্রিয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে হয়ে থাকে, তাহলে প্রকল্প পরিচালকের পছন্দের ব্যক্তিরা কীভাবে নিয়োগ পেলেন? আর কোটি টাকার কথিত ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগই বা কেন উঠছে?
অন্যদিকে, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ‘ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড’-এর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার একটি ছোট অফিস থেকে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আতিকুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার এই নীরবতা অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র আরও জানিয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, এই অনিয়মের তথ্য অনুসন্ধান ও সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে প্রতিবেদকের ওপর চাপ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্য প্রকাশের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সুশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে যদি এভাবে নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতি চলতে থাকে, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে আনার দাবি জানিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নের নামে চলা এই প্রকল্প কি আদৌ জনস্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি এটি পরিণত হয়েছে প্রভাবশালী চক্রের কোটি টাকা লুটপাটের নতুন ক্ষেত্র?
