গণপূর্তের লিফট টেন্ডারে ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট’ ! প্রতিযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগই কি ঘুরে গেল নির্দিষ্ট কোম্পানির পক্ষে ?

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক :  দীর্ঘদিন ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের লিফট ক্রয় ও সরবরাহকে ঘিরে সীমিত প্রতিযোগিতা, অতিমূল্য নির্ধারণ এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছিল সংশ্লিষ্ট মহলে। সরকারি ভবনে ব্যবহৃত লিফট কেনাকাটায় বারবার একই ধরনের কোম্পানির আধিপত্য এবং কঠোর শর্তে দরপত্র সীমাবদ্ধ করার অভিযোগ এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আমলে নিতে বাধ্য হয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।


বিজ্ঞাপন

উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—দরপত্রে অধিকসংখ্যক যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া, অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক শর্ত শিথিল করা এবং বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা।

কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টো। মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশ পাশ কাটিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর নিজস্বভাবে স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন করে এমন কিছু শর্ত আরোপ করেছে, যা আবারও সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


বিজ্ঞাপন

মন্ত্রণালয়ের কমিটি বনাম গণপূর্তের ‘কাটাছেঁড়া’ :  নথিপত্রে দেখা গেছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ)-কে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে।


বিজ্ঞাপন

কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পদমর্যাদার প্রতিনিধি, গণপূর্তের ই/এম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ই/এম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী।

কমিটি বাজার বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং বিদ্যমান ই/এম দর তপশিল পর্যালোচনা করে দেখতে পায়—গণপূর্তের বিদ্যমান শর্ত এতটাই কঠিন ও বাছাইকৃত যে অধিকাংশ কোম্পানি দরপত্রে অংশ নিতে পারে না।

এর ফলে সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠান উচ্চমূল্যে দরপত্র দাখিল করছে এবং প্রতিযোগিতা কার্যত অনুপস্থিত হয়ে পড়েছে। কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, কাস্টমস ডিউটি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি কঠোর স্পেসিফিকেশনই লিফটের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৬৫ বছরের অভিজ্ঞতা’—কার স্বার্থে ?  গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিদ্যমান তপশিলে ‘এ’ টাইপ লিফটের জন্য ৬৫ বছরের উৎপাদন অভিজ্ঞতা এবং ১০ মিটার/সেকেন্ড গতির উৎপাদন সক্ষমতার শর্ত ছিল। এই ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছিল কো-নে, মিৎসুবিশি, ওটিআইএস, শিন্ডলার, টিকেই, ফুজিটেক ও হিটাচির মতো কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডকে।

কিন্তু কমিটি দেখতে পায়, বাংলাদেশের বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ আন্তর্জাতিক কোম্পানিরই ৬৫ বছরের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে এই শর্ত বাস্তবে প্রতিযোগিতা সীমিত করছে। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো—গণপূর্তের নিজস্ব তপশিলেই ৪ মিটার/সেকেন্ডের বেশি গতির লিফটের বিস্তারিত কারিগরি বিবরণ নেই, অথচ ১০ মিটার/সেকেন্ড সক্ষমতার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনবিসি-২০২০ অনুযায়ী ভবনে লিফটের সর্বোচ্চ গতি ৫ মিটার/সেকেন্ড উল্লেখ রয়েছে।

এসব বিবেচনায় কমিটি সুপারিশ করে, ৬৫ বছরের পরিবর্তে ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা, ১০ মিটার/সেকেন্ড শর্ত শিথিল, ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী আলাদা লিফট ক্যাটাগরি নির্ধারণ।

ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী নতুন কাঠামো : কমিটি ‘এ১’, ‘এ২’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’ টাইপে নতুনভাবে শ্রেণিবিন্যাসের সুপারিশ করে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী  : ৫–২০ মিটার ভবন: বাংলাদেশে তৈরি বা সংযোজিত লিফট গ্রহণযোগ্য, ২০–৩০ মিটার ভবন: যে কোনো দেশের উৎপাদিত লিফট ৩০–১০০ মিটার ভবন: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের লিফট ১০০ মিটারের বেশি ভবন: উচ্চগতির আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন লিফট। কমিটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে—কারিগরি শর্ত এমন হওয়া যাবে না, যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ে গেল ভিন্ন প্রস্তাব  : অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ গণপূর্ত অধিদপ্তর “কাটাছেঁড়া” করে নিজেদের মতো করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। আর সেখানেই শুরু হয় বিতর্ক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত নথিতে দেখা যায়:
দেশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, নির্দিষ্ট সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, টেস্টিং টাওয়ার, আরঅ্যান্ডডি সেন্টার, নিজস্ব কন্ট্রোলার-পিসিবি উৎপাদনের মতো শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষ করে ‘বি১’ টাইপ লিফটের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে  :
প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব টেস্টিং টাওয়ার থাকতে হবে,
নিজস্ব আরঅ্যান্ডডি ইউনিট থাকতে হবে, নিজস্ব কারখানায় কন্ট্রোলার, ইনভার্টার, মাদারবোর্ড, পিসিবি উৎপাদন করতে হবে, আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্দিষ্ট সার্টিফিকেট থাকতে হবে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই ধরনের শর্ত বাস্তবে বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব।

“সিন্ডিকেট ভাঙতে গিয়ে সিন্ডিকেটই আরও শক্তিশালী ?” গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বহু বছর ধরে লিফট সরবরাহে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্তের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও নির্দিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগসাজশ রয়েছে।

এর আগে ওয়ালটন কোম্পানির অর্থায়নে গণপূর্তের চারজন নির্বাহী প্রকৌশলী এবং একজন প্রকৌশলীর স্ত্রীসহ বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগও উঠেছিল।

বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সে সময় তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের প্রত্যক্ষ মদদের অভিযোগও ওঠে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন স্পেসিফিকেশনেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

বাজারে দেশীয়ভাবে লিফট উৎপাদন ও সংযোজনকারী বহু প্রতিষ্ঠান থাকলেও এমন শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা পূরণ করতে পারবে কেবল দু-একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বা তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা। ফলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কার্যত প্রতিযোগিতা থেকেই ছিটকে পড়ছেন।

“উচ্চতা অনুযায়ী স্পেসিফিকেশন মানা হয়নি” :  কমিটির অন্যতম সদস্য এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. শরীফ মোহাম্মদ মমিনুজ্জামান বলেন, “বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব পণ্য আনা হয় তার কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে হবে। একই ধরনের পণ্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই জায়গাতেই হয়। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি। উচ্চতা অনুযায়ী স্পেসিফিকেশন হওয়া উচিত।”

তবে সুপারিশ পরিবর্তন করে নতুন স্পেসিফিকেশন তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন,  “মন্ত্রণালয় থেকে কোনো বিষয়ে কাগজ এলে তাতে যা উল্লেখ থাকে, তার বাইরে কিছু করা হয় না। কিছু বিষয় কৌশল হিসেবে নেওয়া হয়।”

প্রশ্নের মুখে স্বচ্ছতা : বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ক্রয়ে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা জরুরি হলেও এমন শর্ত আরোপ করা উচিত নয়, যা প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। কারণ প্রতিযোগিতা কমে গেলে দরপত্রের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, নতুন উদ্যোক্তারা বাজার থেকে ছিটকে পড়ে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি।

এখন বড় প্রশ্ন হলো— গণপূর্ত অধিদপ্তরের লিফট ক্রয়ের নতুন তপশিল কি সত্যিই “গুণগত মান নিশ্চিতের কৌশল”, নাকি এটি আবারও পুরনো সিন্ডিকেটকে রক্ষা করার নতুন ছক?

👁️ 63 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *