৪ তলা ভবনে ব্যয় সাড়ে ১৬ কোটি টাকা! বান্দরবানে হর্টিকালচার সেন্টারের নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত গ্রাম বাংলার খবর চট্টগ্রাম জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন সারাদেশ

বান্দরবান প্রতিনিধি  : বান্দরবানের বালাঘাটা এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রিত হর্টিকালচার সেন্টারে নির্মাণাধীন ৪ তলা বিশিষ্ট “ল্যাবরেটরি কাম অফিস” ভবন ঘিরে উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ। প্রায় ১৬ কোটি ৪৬ লাখ ১৫ হাজার ৫৫৯ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ ভবনকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র প্রশ্ন ও ক্ষোভ।


বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে নিয়মিত তদারকি ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ভবন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের সামগ্রী, আর পুরো প্রকল্প তদারকি করা হচ্ছে সরেজমিনে উপস্থিত না থেকে ঢাকায় বসে ভিডিও কলে।

ঢাকায় বসেই চলছে তদারকি”  : সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রকল্পটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এমভি ও ইসি। তবে কাজের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাউকেই নিয়মিত প্রকল্প এলাকায় দেখা যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।


বিজ্ঞাপন

নির্মাণকাজে নিয়োজিত কয়েকজন শ্রমিক জানান, স্থানীয় এক ব্যক্তির মোবাইল ফোনের ভিডিও কলের মাধ্যমে ঢাকায় বসে কাজ মনিটরিং করেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে নির্মাণকাজে মান নিয়ন্ত্রণ বা নিয়মিত ল্যাব টেস্ট ছাড়াই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছামতো কাজ পরিচালিত হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন

আড়ালে তড়িঘড়ি নির্মাণ, প্রশ্নের মুখে মান নিয়ন্ত্রণ  : হর্টিকালচার সেন্টারের ভেতরে নির্জন স্থানে ভবনটি নির্মাণ হওয়ায় সাধারণ মানুষের নজর এড়িয়ে দ্রুতগতিতে কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বর্তমানে ভবনের টাইলস বসানো, বিদ্যুৎ সংযোগ, ইন্টারনেট সংযোগ, স্যানিটেশন ও পাইপ ফিল্টারের কাজ চলছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে স্বল্পমূল্যের নিম্নমানের সামগ্রী।

অভিযোগ রয়েছে, ভবনের ফ্লোর ভরাটে বালির পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে পাহাড়ি মাটি। এছাড়া নিম্নমানের ইট, বালি, খোয়া ও পাথর দিয়েই এখনও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকরা।

“১৫ এমএম রডের জায়গায় ব্যবহার ৪-৫ সুতা রড” :  নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী ভবনের পিলারে ৬ সুতা ১৫ এমএম রড ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক স্থানে ৪ বা ৫ সুতা রড ব্যবহার করা হয়েছে।

এছাড়া সরকারি ভবন নির্মাণের শর্ত অনুযায়ী ৪১ দিন লোড টেস্ট করার কথা থাকলেও সেটিও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্মাণশ্রমিকদের ভাষ্য, “কন্ট্রাক্টর যে মালামাল দেয়, তাই দিয়েই কাজ করতে হয়।”

“সাড়ে ১৬ কোটি টাকার ভবন, অথচ মান প্রশ্নবিদ্ধ”  : স্থানীয় কয়েকজন অভিজ্ঞ ঠিকাদার জানান, একটি চারতলা ভবন যত আধুনিকই হোক না কেন, ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হওয়ার কথা নয়। তাদের ভাষ্য, “আমরা বিভিন্ন সরকারি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছি।

সেখানে ৪-৫ কোটি টাকায় ভবন হয়েছে। কিন্তু এখানে ৪ তলা ভবনে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা ব্যয় অস্বাভাবিক। প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার মিলে ভাগ-বাটোয়ারার জন্যই এমন অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে।” তারা আরও বলেন, দুদকের মাধ্যমে অনুসন্ধান হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।

“অফিস ঠিক থাকলে সব ঠিক” : অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বান্দরবানে পরিদর্শনে এলে তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং অন্যান্য খরচ বহন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এমনকি “ভালো মানের কাজ হয়েছে” মর্মে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য পরিদর্শন টিমকে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কনস্ট্রাকশন ফার্মকে ঠিকাদার যেভাবে নির্দেশ দেন, সেভাবেই “সন্তোষজনক কাজ” দেখিয়ে রিপোর্ট দেওয়া হয়।

প্রকল্প এলাকায় নেই প্রকৌশলী, মিলেনি ঠিকাদারেরও দেখা  :
সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় নির্মাণকাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাউকে পাওয়া যায়নি। সরকারি তদারকির দায়িত্বে থাকা কোনো প্রকৌশলীও উপস্থিত ছিলেন না।

জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিজস্ব প্রকৌশল বিভাগ না থাকায় একটি কনস্ট্রাকশন ফার্মের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

“ফেসবুকে গান, প্রকল্পে অনুপস্থিতি”  : অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকলেও নিয়মিত প্রকল্প এলাকায় যান না। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনেকটাই স্বাধীনভাবে কাজ পরিচালনা করছে।

আওয়ামী ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ  :  কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, তালহা জুবাইর আওয়ামী রাজনীতির মতাদর্শী হওয়ায় বিগত সরকারের আমলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে একাধিক পুরস্কারও গ্রহণ করেন।

মুখ খুললেন না প্রকল্প পরিচালক  : ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মুঠোফোনে বলেন,  “কিছু বলার থাকলে অফিসে এসে সরাসরি কথা বলেন।”
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

২০২৬ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা  : উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রকল্পটির কার্যাদেশ দেওয়া হয়। আগামী ২০২৬ সালের জুন মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, তালহা জুবাইরের তত্ত্বাবধানে বান্দরবান ছাড়াও দেশের আরও কয়েকটি জেলায় একই ধরনের ভবন নির্মাণকাজে অনিয়ম হয়েছে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।

👁️ 75 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *