যমুনা-মেঘনায় ‘গণবদলি বাণিজ্য’ : তেল চোর সিন্ডিকেটের সদস্যদেরই লোভনীয় পোস্টিংয়ের অভিযোগ !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত কর্পোরেট সংবাদ জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  :   রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান Jamuna Oil Company Limited ও Meghna Petroleum Limited–এ নজিরবিহীন গণবদলিকে ঘিরে তোলপাড় চলছে জ্বালানি খাতে। একযোগে প্রায় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলির আদেশ দেয়া হলেও এর আড়ালে চলছে ‘দৈত্যনীতি’, তদবির, ঘুষ বাণিজ্য এবং তেল চুরি সিন্ডিকেটকে রক্ষার অভিযোগ।


বিজ্ঞাপন

১৩ মে যমুনা অয়েলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এইচ আর মোহাম্মদ জোবায়ের চৌধুরী স্বাক্ষরিত আদেশে ৪৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়। পরদিন ১৪ মে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (এইচআর) সঞ্জীব নন্দী (অ.দা.) স্বাক্ষরিত আরেক আদেশে বদলি করা হয় আরও ৫১ জনকে।

দুই প্রতিষ্ঠানের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলছেন, “একসঙ্গে এত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলির ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।” তবে এই গণবদলির আড়ালে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন ও সিন্ডিকেট রক্ষার অভিযোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।


বিজ্ঞাপন

সিবিএ নেতাদের নিয়ে ‘দ্বিমুখী নীতি’ : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) বিধি অনুযায়ী, সিবিএ নেতাদের বদলিতে কোনো আইনি বাধা নেই। সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো একই স্থানে তিন বছরের বেশি কর্মরত থাকলে তাদেরও বদলি করা যায়।


বিজ্ঞাপন

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে—মেঘনা পেট্রোলিয়ামে একাধিক সিবিএ নেতাকে বদলি করা হলেও যমুনা অয়েলে একজন সিবিএ নেতার নামও তালিকায় নেই।

মেঘনায় বদলিকৃতদের মধ্যে রয়েছেন রনি কর, আইয়ুব খান, আব্দুল আলীম, ফরিদুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলামসহ একাধিক সিবিএ নেতা। অন্যদিকে যমুনা অয়েলের সিবিএ নেতারা বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন।

বিশেষ করে বাঘাবাড়ি ডিপোতে ২৯ বছর ধরে কর্মরত সিবিএ নেতা অরুণ চৌধুরীর নাম গণবদলির তালিকায় না থাকায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে।

টাকা দিলেই বদলি মওকুফ ’! যমুনা অয়েলের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে—বদলি তালিকা তৈরির সময় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অনেককে রেহাই দেয়া হয়েছে, আবার অনেক দুর্নীতিবাজকে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক ডিপোতে পোস্টিং দেয়া হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত নাম সিনিয়র পার্সোনাল অফিসার গোলাম সারোয়ার। তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা টার্মিনালে কর্মরত থাকলেও বদলির তালিকায় তার নাম নেই।

একইভাবে— মো. ইব্রাহীম ২০০৫ সাল থেকে একই টার্মিনালে কর্মরত, মো. আজিজ ১৩ বছর ধরে একই অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন, তবুও তাদের কাউকে বদলি করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, এদের মতো আরও অনেকেই অর্থের বিনিময়ে গণবদলি থেকে বাদ পড়েছেন।

তেল চোর সিন্ডিকেট’ ভেঙে নয়, ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে  !
জ্বালানি খাতে সবচেয়ে আলোচিত বাঘাবাড়ি ডিপোর কথিত “তেল চোর সাদেকীন সিন্ডিকেট” নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পরই নড়েচড়ে বসে মন্ত্রণালয়।

গত ৯ মে বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জের ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষ গণবদলির সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে—সিন্ডিকেট ভাঙার বদলে সদস্যদের আরও লাভজনক জায়গায় পুনর্বাসন করা হয়েছে।

সিন্ডিকেট প্রধানের ‘পুরস্কারমূলক’ বদলি ?  অভিযোগ অনুযায়ী— বাঘাবাড়ি ডিপোর কথিত সিন্ডিকেট প্রধান আবুল ফজল মো. সাদেকীনকে বদলি করা হয়েছে দৌলতপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে।

তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (অপারেশন) মাহাবুল আলমকে দেয়া হয়েছে শ্রীমঙ্গল ডিপোর দায়িত্ব। অপারেটর জাকির হোসেনকে পাঠানো হয়েছে ফতুল্লা ডিপোতে। অভিযোগ রয়েছে, অপারেটর হয়েও তিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘গেজার’ বা তেল পরিমাপের দায়িত্ব পালন করতেন।

গেজার হাফিজুর রহমানকে বদলি করা হয়েছে পার্বতীপুর ডিপোতে। অর্থাৎ, যাদের বিরুদ্ধে তেল চুরির অভিযোগ, তাদের অনেককেই আবার কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে বসানো হয়েছে।

নিজ এলাকার ডিপো ইনচার্জ !  আরেক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে ভৈরব বাজার ডিপোর ডেপুটি ম্যানেজার মো. মতিউর রহমানকে বদলি করা হয়েছে বাঘাবাড়ি ডিপোতে—যার বাড়ি ওই ডিপোর পাশেই।

এ নিয়ে যমুনা অয়েলের একাধিক কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন—নিজ এলাকার ডিপো ইনচার্জ হয়ে তিনি কতটা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন ?

অস্পৃশ্য’ দুই কর্মকর্তা :  গণবদলির তালিকায় নাম না থাকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে।
তারা হলেন— ধীমান কান্তি দাস, ম্যানেজার (ফাইনান্স), হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়া, ডেপুটি ম্যানেজার (অ্যাডমিন), এমডির দপ্তর, ধীমান কান্তি দাস ২০০৭ সালে অ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে প্রধান কার্যালয়ে যোগ দিয়ে এখনও সেখানেই বহাল আছেন।

আর হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়া ২০১১ সালে যোগদানের পর থেকে কার্যত এমডির দপ্তরকেন্দ্রিক দায়িত্বেই রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এমডির দপ্তরে যেকোনো অভিযোগপত্র আগে ইয়াহিয়ার হাত দিয়েই যায়। ফলে তাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের মানুষ’ হিসেবেও দেখা হয়।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর বিপিসির সমন্বিত সভায় তিন বছরের বেশি সময় একই কর্মস্থলে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রহস্যজনক বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে।

দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শত অভিযোগ, তবুও ধরাছোঁয়ার বাইরে : যমুনা অয়েলের অন্তত ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও তাদের অধিকাংশই বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিপিসি ও যমুনা অয়েলের প্রভাবশালী একটি চক্রকে “ম্যানেজ” করেই বছরের পর বছর তেল চুরি, পোস্টিং বাণিজ্য ও অনিয়ম চালিয়ে এসেছে সিন্ডিকেটটি।
তবে এবারের গণবদলির ফলে অন্তত আংশিকভাবে হলেও অনিয়ম কমবে বলে আশা করছেন প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মকর্তা।

যদিও তাদের আশঙ্কা—যদি দুর্নীতির মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তাহলে “গণবদলি” শেষ পর্যন্ত শুধুই হবে সিন্ডিকেট পুনর্বিন্যাসের আরেকটি কৌশল।

👁️ 38 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *