
শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া (খুলনা) : পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জমতে শুরু করেছে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া পশুহাট।

হাটে এবারও দেশি জাতের ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা অনেক বেশি। বড় গরুর চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় দুশ্চিন্তায় আছে খামারি ও চাষিরা। ক্রেতারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম কিছুটা বেশি।
বৃহস্পতিবার (২২ মে) সাপ্তাহিক এই পশুহাট ঘুরে দেখা গেছে, হাটে হাজারেরও বেশি গরু, ছাগল, ভেড়া মহিষের উপস্থিতি ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বেপারিরা কোরবানির পশু ক্রয়ের জন্য হাটে এসেছেন। বেপারিদের সঙ্গে খামারিদের গরু বেচাকেনা করতে দীর্ঘক্ষণ ধরে দর কষাকষি করতে দেখা গেছে। কোরবানির পশু ও ক্রেতা বিক্রেতাদের সমাগমে হাটটি বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে। হাটের বিশাল আকৃতির গরুগুলো সবার নজর কাড়লেও সাধারণ ক্রেতাদের মাঝারি সাইজের গরুতে আগ্রহ বেশি।

কোরবানির গরু কিনতে আসা মোনতাজ আলি জানান, কোরবানি দেওয়ার জন্য হাটে একটি গরু কিনতে এসেছি। বাজারে গরুর দাম অনেক বেশি। একটু বড় সাইজের গরুগুলো দাম বলছে দুই লাখ টাকা। ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে মাঝারি সাইজের একটি গরু খুঁজছি। কিন্তু গরু পছন্দ হলেও দেড় লাখ টাকার নিচে দাম বলছে না।

খামারি রুহুল শেখ বলেন, ‘কোরবানির জন্য ফার্মে ১০টি গরু পালছিলাম। আজকে ৫টি গরু হাটে নিয়ে এসেছি। গরুর দাম শুনে অনেকই বলছে দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে। এখন গোখাদ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে। গরু লালন-পালন করতে অনেক খরচ হয়। সব কিছু হিসেব করে দাম চাওয়া হচ্ছে।
খুলনা থেকে গরু কিনতে আসা মোসলেম বেপারি বলেন, ‘এই হাটে অনেক গরু আমদানি হয়। যার কারণে ট্রাক নিয়ে গুরু কিনতে এসেছি। ১০টি গরু কেনা হয়েছে। আর ৫টি গরু কিনে ঢাকায় নিয়ে যাব। মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা বেশি থাকার কারণে এই ধরনের গরু বেশি কেনা হয়েছে।’
কোরবানির ছাগল কিনতে আসা সুমন আহমেদ বলেন, ‘আজকের হাটে কোরবানি দেওয়ার উপযুক্ত প্রচুর ছাগল উঠেছে। ছাগলের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। ২০ হাজার টাকায় পছন্দমতো একটি ছাগল কিনতে পেরেছি।
হাট মালিক কর্তৃপক্ষ জানান, কোরবানির ঈদের এখনো কয়েকদিন বাকি রয়েছে। যার কারণে হাটে কেনাবেচা এখনো সেভাবে বাড়েনি। অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সবসময় সতর্ক করা হচ্ছে। মেশিনের মাধ্যমে জাল টাকা পরীক্ষা করা হচ্ছে। গরুর স্বাস্থ্য পরিক্ষার জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করছে। খর্ণিয়া পশুর হাটের সার্বিক পরিস্থিতি ও পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মোঃ আশরাফুল কবির বলেন:
“খর্ণিয়া পশুর হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতারা যাতে নির্বিঘ্নে সুস্থ-সবল পশু কেনাবেচা করতে পারেন, সেজন্য আমাদের প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। হাটে আসা কোনো পশু অসুস্থ হয়ে পড়লে বা কারো কোনো পশুর স্বাস্থ্য নিয়ে সন্দেহ থাকলে আমাদের টিম তাৎক্ষণিক বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও পরামর্শ দিচ্ছে।“
তিনি আরো বলেন ক্ষতিকারক রাসায়নিক ও স্টেরয়েড মুক্ত পশু: এবার খামারিরা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে খড়, ঘাস ও দানাদার খাদ্য খাইয়ে পশু মোটাতাজা করেছেন। ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগ করে মোটাতাজাকরণ করা পশুর সরবরাহ রোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগ কঠোর নজরদারি রাখছে।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী খর্ণিয়া পশুর হাট ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পূর্ণরূপে জমে উঠেছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় এবং বিপুল পরিমাণ পশুর আমদানিতে হাটে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ।
খর্ণিয়া পশুর হাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মিজ সবিতা সরকার বলেন “খর্ণিয়া পশুর হাট ডুমুরিয়ার অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী এবং বড় একটি হাট।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে এই হাটে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা ও বিক্রেতারা যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদ পরিবেশে বেচাকেনা করতে পারেন, সেজন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি হাটের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেন: অতিরিক্ত হাসিল রোধে কঠোর মনিটরিং: হাটে সরকার নির্ধারিত চার্টের বাইরে কোনোভাবেই যেন অতিরিক্ত হাসিল বা খাজনা আদায় করা না হয়, সে বিষয়ে পশুর হাট ইজারা কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
টাকা লেনদেনে নিরাপত্তা: ক্রেতা ও ব্যাপারীদের বড় অঙ্কের টাকা লেনদেনের সুবিধার্থে এবং জালিয়াতি রুখতে হাটে জাল টাকা শনাক্তকরণ মেশিনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাদা পোশাকেও পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক দল কাজ করছে।
যানজট নিরসন ও যাতায়াত ব্যবস্থা: খর্ণিয়া হাটের কারণে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে যাতে কোনো ধরনের যানজটের সৃষ্টি না হয় এবং পশুবাহী ট্রাকগুলো যেন সহজে যাতায়াত করতে পারে, সেজন্য বিশেষ ট্রাফিক ও পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারি: হাটে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি বা ওজনে কারচুপি এবং আইনশৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) প্রস্তুত রয়েছে।
ইউএনও মিজ সবিতা সরকার আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ দপ্তর এবং হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির যৌথ সমন্বিত প্রচেষ্টায় খর্ণিয়া হাটে এবার অত্যন্ত চমৎকার ও সুষ্ঠু পরিবেশে কোরবানির পশু কেনাবেচা সম্পন্ন হবে।
