স্বচ্ছ নিয়োগে কঠোর নজরদারি : ফায়ার সার্ভিসে ‘জিরো তদবির’ বার্তা ডিজি জাহেদ কামালের

Uncategorized জাতীয় ঢাকা প্রশাসনিক সংবাদ বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী সারাদেশ

বিশেষ  প্রতিবেদক  :  ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে চলমান নিয়োগ কার্যক্রমকে ঘিরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিতর্কমুক্ত রাখতে সরাসরি তদারকি করছেন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল।


বিজ্ঞাপন

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর পর এটিই ফায়ার সার্ভিসের প্রথম বড় নিয়োগ কার্যক্রম। ফলে পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও সন্দেহমুক্ত রাখতে একাধিক স্তরে নজরদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

সামরিক বাহিনীতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের স্বীকৃতি হিসেবে ‘এনডিসি’, ‘এএফডব্লিউসি’ ও ‘পিএসসি’ ডিগ্রিধারী এই সেনা কর্মকর্তা শুরু থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের তদবির, প্রভাব বা অনিয়মের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।


বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতে নিয়োগ :  ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ২০০ জন ফায়ার ফাইটার এবং ড্রাইভারসহ অন্যান্য পদে ৪২ জনসহ মোট ২৪২ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিপরীতে প্রায় ২৪ হাজার আবেদন জমা পড়েছে।


বিজ্ঞাপন

বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচলে অবস্থিত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স মাল্টিপারপাস ট্রেনিং গ্রাউন্ডে শারীরিক যোগ্যতা যাচাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

পরীক্ষার্থীদের উচ্চতা, ওজন, বুকের মাপ, ৪০০ মিটার দৌড়, পুশ-আপ এবং মেডিক্যাল পরীক্ষাসহ একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হচ্ছে। প্রতিদিনের পরীক্ষা শেষে তাৎক্ষণিকভাবে ফলাফলও প্রকাশ করা হচ্ছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন নজরদারি, ভিডিও রেকর্ডিং এবং বহুমাত্রিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে দেওয়া হয়েছে একাধিক বিশেষ নির্দেশনা, যা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তাও গোপন ও প্রকাশ্য উভয়ভাবেই তদারকি করা হচ্ছে।

‘চাপ নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ’  :  সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর পর বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও উচ্চপর্যায়ের মহল থেকে মহাপরিচালকের কাছে সুপারিশ ও তদবিরের চেষ্টা হয়েছে। তবে তিনি কোনো ধরনের চাপ আমলে নিচ্ছেন না।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে ডিজি স্পষ্ট নির্দেশনা দেন— কোনো সুপারিশ, প্রভাব বা ভয়ভীতি নয়; শুধুমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতেই প্রার্থী নির্বাচন করতে হবে।

দীর্ঘ সময় ধরে মহাপরিচালকের নেতৃত্বে কাজ করা কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ বন্ধ করতে পদ্ধতি, প্রযুক্তি ও কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রভাব খাটানোর কোনো অপশনই রাখা হয়নি’  :  ফায়ার সার্ভিসের এক পরিদর্শক রেজায়ে রাব্বি বলেন, নিয়োগকেন্দ্রিক প্রতারণা, ক্ষমতার প্রভাব কিংবা অর্থের জোর এখন আর কার্যকর নয়।

তার ভাষায়, “প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার কারণে প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই। এমনভাবে পুরো প্রক্রিয়া সাজানো হয়েছে যে, অনিয়মের কোনো অপশনই রাখা হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “চাকরি জীবনে এই প্রথম দেখলাম নিয়োগ প্রক্রিয়াকে এতটা প্রভাবমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

‘মেধা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ’  :  পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সততা ও দেশপ্রেমের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কর্মকর্তারা নতুন বাংলাদেশ গঠনের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।

তিনি বলেন, “মেধাবীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সততার সঙ্গে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। মাঠ পর্যায়ের শারীরিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। লিখিত পরীক্ষার খাতা ওএমআর পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থায় স্বজনপ্রীতির কোনো সুযোগ নেই।”

প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধেও কড়া অবস্থান৷ :  অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানায়, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে সক্রিয় কিছু প্রতারক চক্রও তৎপর হওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো অভিযোগ ফায়ার সার্ভিসে জমা পড়েনি এবং গণমাধ্যমেও প্রকাশ হয়নি।

প্রার্থীদের প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক করা হচ্ছে :  একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চক্রগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অযোগ্য কোনো প্রার্থী যাতে নিয়োগ না পায়, সে লক্ষ্যে প্রতিটি ধাপে কঠোর যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ দলও কাজ করছে।

পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছাড়া অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

জুলাইয়ে লিখিত, আগস্টে মৌখিক পরীক্ষা  :  ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, “যোগ্য প্রার্থীরাই চাকরি পাবেন। কোনো ধরনের সুপারিশ বা অনৈতিক প্রভাবের সুযোগ দেওয়া হবে না।”

তার ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে লিখিত পরীক্ষা এবং আগস্টে মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে পুরো নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণ ও পেশাগত পরিচয়  :  ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিনের স্থলাভিষিক্ত হন।

দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তাকে ফায়ার সার্ভিস প্রধানের দায়িত্ব দিয়ে তার চাকরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে ন্যস্ত করা হয়।

জনগণের সেবায় নিবেদিত প্রতিষ্ঠান  :  স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।

প্রতিষ্ঠানটির মিশন— “দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পদ রক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।”

ভিশন— “অগ্নিকাণ্ডসহ সকল দুর্যোগ মোকাবিলা ও নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সক্ষমতা অর্জন।”

প্রতিষ্ঠানটির মূলমন্ত্র— গতি, সেবা ও ত্যাগ !  সর্বশেষ প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিসে বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ থেকে ১৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া সারা দেশে ৫০ হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে সহায়তা করছেন।

দেশে বর্তমানে ৫ শতাধিক ফায়ার স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৯টি বিশেষ ক্যাটাগরি স্টেশন, ৯৫টি ‘এ’ ক্যাটাগরি স্টেশন, ৩১৪টি ‘বি’ ক্যাটাগরি স্টেশন, ৮টি ‘বি’ ক্যাটাগরি স্থল ও নদী স্টেশন, ১০০টি ‘সি’ ক্যাটাগরি স্টেশন এবং ১১টি রিভার ফায়ার স্টেশন।

ফায়ার সার্ভিসের রয়েছে আধুনিক ফায়ার টেন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স, উদ্ধারকারী যান, হ্যাজম্যাট ইউনিট, অগ্নিনির্বাপন নৌযান, রেসকিউ বোট, এরিয়াল ও টার্নটেবল ল্যাডার, ডুবুরি ইউনিট, সিভিল ডিফেন্স ইউনিট, প্রশিক্ষণ একাডেমি ও ট্রেনিং সেন্টার।
অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ, সড়ক দুর্ঘটনায় উদ্ধার, ভবন ধস, নদী ও পানিতে উদ্ধার অভিযান, রাসায়নিক দুর্ঘটনা মোকাবিলা, ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, অগ্নি নিরাপত্তা পরিদর্শন এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

👁️ 39 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *