
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়, সরকার বদলায়, রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়, কিন্তু সাংবাদিকের ওপর হামলা, হুমকি, মামলা, লাঞ্ছনা কিংবা হত্যার ঘটনাগুলো যেন একই থেকে যায়।

একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো—কোনো গোষ্ঠী, দল কিংবা স্বার্থান্বেষী মহল সমালোচনা সহ্য করতে না পারলেই প্রথম আঘাতটি আসে সংবাদকর্মীদের ওপর। স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক কর্মী, দুর্নীতিবাজ চক্র, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল—অনেক ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে তারা নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই স্তম্ভের কর্মীরাই আজ সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের শারীরিক হামলা, হুমকি, ক্যামেরা ভাঙচুর, অপহরণচেষ্টা, মিথ্যা মামলা এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার ঘটনা বারবার সামনে এসেছে।
হামলার শিকার সাংবাদিক, নীরব প্রতিষ্ঠান : দেশের বিভিন্ন জেলায় ভূমি দখল, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, অবৈধ বালু উত্তোলন, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার কিংবা প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের ওপর হামলার বহু অভিযোগ রয়েছে। অনেক ঘটনায় অপরাধীরা চিহ্নিত হলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যায়। ফলে হামলাকারীদের মধ্যে তৈরি হয় দায়মুক্তির সংস্কৃতি।

একটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো—সাংবাদিকের ওপর হামলাকে অনেকেই এখন রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে বৈধ মনে করতে শুরু করেছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলে, “সাংবাদিকরা বেশি লিখেছে”, “স্বার্থে আঘাত করেছে”, “শিক্ষা দেওয়া হয়েছে”। এই মানসিকতা শুধু গণমাধ্যমের জন্য নয়, পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যই হুমকিস্বরূপ।

সাংবাদিকদের আত্মসমালোচনাও জরুরি : একই সঙ্গে এটিও সত্য যে সাংবাদিকতা পেশার ভেতরেও নানা সংকট রয়েছে। দলীয় আনুগত্য, অপেশাদার আচরণ, তথ্য যাচাই ছাড়া সংবাদ প্রকাশ, ব্যক্তিস্বার্থে সংবাদ ব্যবহার কিংবা তথাকথিত হলুদ সাংবাদিকতার অভিযোগও জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। কিছু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরো সাংবাদিক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
কিন্তু কোনো সাংবাদিকের পেশাগত ভুল, নৈতিক বিচ্যুতি বা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিচার আদালত ও আইন করবে—লাঠি, হামলা কিংবা হত্যাচেষ্টা নয়। কোনো সংবাদে আপত্তি থাকলে তার প্রতিকার আইনি ও নৈতিক পদ্ধতিতেই হতে হবে।
সারাদেশে আতঙ্কের পরিবেশ : জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় ক্ষমতাবানদের চাপের মুখে কাজ করেন। সংবাদ প্রকাশের কারণে অনেকেই বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কেউ আবার প্রাণও দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন ট্রল, অপপ্রচার, চরিত্রহনন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য হুমকিও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কিংবা দুর্নীতিবিরোধী প্রতিবেদন প্রকাশের পর এসব হামলার মাত্রা আরও বাড়তে দেখা যায়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায় ? একজন সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়া মানে শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; এটি জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপর আঘাত। গণমাধ্যমকে দুর্বল করা মানে জবাবদিহিতা দুর্বল করা, দুর্নীতিকে শক্তিশালী করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো— সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা। মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য কার্যকর সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ থেকে সাংবাদিকতাকে মুক্ত রাখা।
শেষ কথা : সাংবাদিক পেটানো যদি কোনো সমাজে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়, তাহলে সেই সমাজে সত্য বলার সাহস ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। যে রাষ্ট্রে কলম ভয় পায়, ক্যামেরা নীরব হয়ে যায় এবং সংবাদকর্মী আতঙ্কে থাকে, সেখানে দুর্নীতি, অপশাসন ও ক্ষমতার অপব্যবহার আরও শক্তিশালী হয়।
সাংবাদিকদের সমালোচনা করা যায়, তাদের ভুলের বিচার হতে পারে, কিন্তু হামলা, হুমকি কিংবা হত্যা কখনোই কোনো সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভকে রক্ষা করা মানে কেবল সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে রক্ষা করারও লড়াই।
