বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস: ডিগ্রি-কেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে দক্ষতা-পুঁজির রূপান্তর

Uncategorized জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি শিক্ষাঙ্গন সারাদেশ

প্রফেসার ড. আসিফ মিজান  :  আজ বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে একজন বাংলাদেশি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদ হিসেবে আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা পুনর্বিবেচনা করা কেবল প্রাসঙ্গিকই নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই অপরিহার্য।


বিজ্ঞাপন

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বর্তমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের (4IR) যুগে মানব পুঁজি তত্ত্ব (Human Capital Theory) এবং শ্রমবাজারের কাঠামোগত অসঙ্গতি তত্ত্ব (Structural Mismatch Theory) অনুযায়ী, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য এবং বাজারের বাস্তব চাহিদার মধ্যে একটি গভীর ফাটল দৃশ্যমান। আমাদের বর্তমান শিক্ষাকাঠামো তরুণদের প্রকৃত দক্ষতা অর্জনে কতটুকু উপযোগী এবং এই সংকট উত্তরণে আমাদের করণীয় কী, তা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের আলোকে সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা হলো:

বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার উপযোগিতা: একটি নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়ন


বিজ্ঞাপন

জ্ঞান বনাম দক্ষতার তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব  : আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ‘ব্যাংকিং মডেল অব এডুকেশন’ (Paulo Freire-এর তত্ত্বানুযায়ী) দ্বারা চালিত, যেখানে শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্য মুখস্থ করতে বাধ্য করা হয়। এটি সমস্যা সমাধান (Problem-solving) বা সমালোচনামূলক চিন্তন (Critical Thinking) এর মতো উচ্চতর জ্ঞানীয় দক্ষতা (Higher-order Cognitive Skills) বিকাশে ব্যর্থ।


বিজ্ঞাপন

কাঠামোগত অসঙ্গতি (Structural Mismatch)  :
গণমাধ্যম ও ওপেন সোর্স ডেটার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, প্রতি বছর উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এর মূল কারণ—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যে সনাতন ‘ডিগ্রি’ সরবরাহ করছে, বৈশ্বিক ও স্থানীয় শ্রমবাজারের প্রযুক্তিগত চাহিদার সাথে তার কোনো যোগসূত্র নেই।

কারিগরি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক অবমূল্যায়ন  :  সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ (TVET) এখনও আমাদের দেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত, যা একটি গুরুতর পলিসিগত ব্যর্থতা।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও সফল মডেলের তাত্ত্বিক অনুবর্তন

আমাদের এই স্থবিরতা থেকে মুক্তি পেতে বৈশ্বিক কিছু সফল মডেলকে তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন : জার্মানির দ্বৈত শিক্ষা ব্যবস্থা (Dual Training System): জার্মানির এই মডেলটি তাত্ত্বিক শিক্ষা এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। সেখানে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমান্তরালে সরাসরি শিল্পকারখানায় কাজ শেখে, যা শিক্ষাজীবন শেষেই শতভাগ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে।

সিঙ্গাপুরের ‘স্কিলসফিউচার’ (SkillsFuture) উদ্যোগ :
সিঙ্গাপুর মানব পুঁজি রূপান্তরকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা ‘আজীবন শিক্ষণ’ (Lifelong Learning) তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতি বছর নাগরিকদের নতুন দক্ষতা বা আপস্কিলিংয়ের জন্য ক্রেডিট প্রদান করে, যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে তাদের খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

ফিনল্যান্ডের প্রপঞ্চ-ভিত্তিক শিক্ষা (Phenomenon-based Learning)  : প্রথাগত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষার প্রাচীর ভেঙে ফিনল্যান্ড বাস্তব জীবনের নানামুখী সমস্যার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষাক্রম সাজিয়েছে। এটি শিক্ষার্থীদের অভিযোজন ক্ষমতা (Adaptability) এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে, যা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য সবচেয়ে জরুরি। এবং  সংকট উত্তরণে কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক করণীয়

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও শিক্ষানীতির আলোকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে নিম্নোক্ত প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:

কারিকুলামের আমূল সংস্কার ও আন্তর্জাতিকীকরণ  :
শিক্ষাক্রমকে ‘আউটকাম-বেসড এডুকেশন’ (Outcome-Based Education) মডেলে রূপান্তর করতে হবে। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা সায়েন্স এবং ব্লকচেইনের মতো উদীয়মান প্রযুক্তির তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানকে উচ্চশিক্ষার প্রতিটি স্তরে বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক।

একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন (Academia-Industry Collaboration) : বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পখাতের মধ্যে একটি সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক সেতু নির্মাণ করতে হবে। ইন্টার্নশিপ, যৌথ গবেষণা এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যৌথভাবে কোর্স ডিজাইন করার মাধ্যমে ‘দক্ষতার খামতি’ (Skill Gap) দূর করা সম্ভব।

ন্যাশন্যাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (NQF) এর কার্যকর বাস্তবায়ন : জাতীয় স্তরে দক্ষতার একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে, যেন আমাদের তরুণদের অর্জিত দক্ষতা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সরাসরি স্বীকৃতি পায়।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি  : শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া ব্যবস্থার পরিবর্তন অসম্ভব। শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সাথে পরিচিত করতে বড় মাপের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তারুণ্যের জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) চিরকাল স্থায়ী হয় না। আমরা যদি দ্রুত আমাদের শিক্ষাদর্শনকে ‘ডিগ্রি-কেন্দ্রিক’ থেকে ‘দক্ষতা-কেন্দ্রিক’ রূপান্তর করতে না পারি, তবে এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সম্পদে পরিণত হওয়ার পরিবর্তে এক বিরাট অর্থনৈতিক ও সামাজিক দায় (Liability) হিসেবে আবির্ভূত হবে। আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিই হোক আমাদের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। (লেখকঃ – প্রফেসার ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।)

👁️ 25 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *