
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অথরাইজড অফিসার ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১ শাখার উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) পলাশ সিকদারের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নকশা অনুমোদনকে কেন্দ্র করে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। এর মধ্যেই একটি অনলাইন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন তিনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—চলমান অনুসন্ধানের মধ্যেই সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে আইনি চাপ প্রয়োগের চেষ্টা হচ্ছে কি না।

দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগের বিষয়ে পলাশ সিকদারকে ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদের বিবরণ এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য যাচাই-বাছাই করছে সংস্থাটি। অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর তুলনামূলক সীমিত বেতনভাতার বিপরীতে তার নামে ও বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে ওঠে। পিরোজপুরে বাড়ি, জমি, রাজধানীর বসুন্ধরায় নির্মাণাধীন ভবন, বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুদক তথ্য যাচাই করছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।

অন্যদিকে, পলাশ সিকদারের আইনজীবীর পাঠানো লিগ্যাল নোটিশে দাবি করা হয়েছে, প্রকাশিত সংবাদটি মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর। নোটিশে আরও বলা হয়েছে, পূর্বের একটি প্রশাসনিক তদন্তে তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল এবং সাংবাদিক তার বক্তব্য বিকৃত করেছেন। পাশাপাশি সংবাদ অপসারণ, প্রতিবাদ প্রকাশ এবং ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

তবে সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি দুদকের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান চলমান থাকে, আয়কর নথি, সরকারি রেকর্ড কিংবা অভিযোগের ভিত্তিতে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করা গণমাধ্যমের সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। কোনো প্রতিবেদনে তথ্যগত ভুল থাকলে তার জবাব, প্রতিবাদ বা আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে; কিন্তু কেবল আইনি নোটিশ পাঠানো সংবাদটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা প্রমাণ করে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্তে অব্যাহতি পাওয়া এবং দুদকের স্বাধীন অনুসন্ধান—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটি বিভাগের অভ্যন্তরীণ তদন্তের ফলাফল দুর্নীতি দমন কমিশনের সাংবিধানিক ও আইনগত অনুসন্ধানকে বাধাগ্রস্ত করে না। ফলে দুদকের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

এদিকে, উত্তরায় একই জমিতে দুটি পৃথক নকশা অনুমোদন, শাহজাহানপুর এলাকায় নকশা ছাড়াই ভবন নির্মাণে মৌখিক অনুমোদনের অভিযোগসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে বিভিন্ন সূত্রে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। তাই এগুলো যাচাই-সাপেক্ষ অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
গণমাধ্যম নীতিমালা অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য প্রকাশ করা যেমন সাংবাদিকতার দায়িত্ব, তেমনি জনস্বার্থে উত্থাপিত অভিযোগ, সরকারি নথি এবং চলমান অনুসন্ধানের তথ্যও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব। শেষ পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে দুদকের অনুসন্ধান এবং প্রয়োজন হলে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার মাধ্যম নয়; বরং যাচাইযোগ্য তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরাই এর মূল উদ্দেশ্য। ফলে চলমান অনুসন্ধানকে প্রভাবিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা বা সংবাদ প্রকাশ নিরুৎসাহিত করার অভিযোগও জনস্বার্থের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যদি তার পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়।
