প্রতিবাদে নয়, অন্য পত্রিকায় ব্যাখ্যা; লিগ্যাল নোটিশে চাপ  : দুদকের অনুসন্ধান চলমান—রাজউকের পলাশ শিকদারকে ঘিরে নতুন বিতর্ক !

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অথরাইজড অফিসার ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১ শাখার উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) পলাশ সিকদারকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

একদিকে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান চলমান, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পর তিনি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমে প্রতিবাদ না দিয়ে অন্য একটি পত্রিকায় ব্যাখ্যা প্রকাশ এবং পরে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর ঘটনায় বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।

সাংবাদিকতা নীতিমালার আলোচনায় সাধারণভাবে ধরা হয়, কোনো সংবাদে আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমে প্রতিবাদ বা ব্যাখ্যা পাঠিয়ে একই প্ল্যাটফর্মে তা প্রকাশের সুযোগ চাওয়া হয়। তবে পলাশ সিকদার ভিন্ন একটি সংবাদমাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করায় বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এতে মূল প্রতিবেদনের তথ্যের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে তার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।


বিজ্ঞাপন

অন্য পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবাদ : গত ৩০ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত এক প্রতিবাদ বার্তায় পলাশ সিকদার বলেন, সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই, বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার জন্য তিনি গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন।


বিজ্ঞাপন

তিনি দাবি করেন, তিনি আইন ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং যেকোনো তদন্তে শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করে আসছেন। তার প্রত্যাশা, একটি নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হবে। একই সঙ্গে বিভ্রান্তিকর বা অপপ্রচারমূলক সংবাদ প্রকাশ না করে যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।

এরপরই লিগ্যাল নোটিশ  :  এর আগে, ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মুরাদুজ্জামানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক বরাবর একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়।

নোটিশে দাবি করা হয়, ১৫ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনটি “অসত্য, বানোয়াট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মানহানিকর ও হয়রানিমূলক”। আরও অভিযোগ করা হয়, প্রতিবেদনে পলাশ সিকদারের বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে এবং “আমি সাধু নই” মন্তব্যটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

নোটিশে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে করা অভিযোগের তদন্ত শেষে রাজউকের এক পরিচালক তদন্ত পরিচালনা করে ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে পলাশ সিকদারকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন। সেই তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি সাংবাদিককে জানানো হলেও তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে দাবি করা হয়।

লিগ্যাল নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, পলাশ সিকদার ২০০২ সালে বরিশাল পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা এবং পরে ডুয়েট থেকে বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। রাজউকে যোগদানের আগে তিনি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি ও কনসালটেন্সির মাধ্যমে আয় করেছেন বলেও দাবি করা হয়।

নোটিশে অভিযোগ করা হয়, প্রতিবেদনের অভিযোগকারী তার প্রয়াত পিতার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিবারের সদস্য এবং জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ করেছেন। এছাড়া তার সব সম্পদ, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অর্থ ও স্বর্ণ আয়কর রিটার্নে উল্লেখ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

এতে আরও অভিযোগ করা হয়, সাংবাদিক তার অনুমতি ছাড়া কথোপকথন রেকর্ড করেছেন এবং সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৫ ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করেছেন। সাত দিনের মধ্যে প্রতিবাদ ও ক্ষমা প্রকাশ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।

দুদকের অনুসন্ধান অব্যাহত : অন্যদিকে, পলাশ সিকদারের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান আরও জোরদার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ বিষয়ে সম্প্রতি দুদকের সেগুনবাগিচা প্রধান কার্যালয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক মানসী বিশ্বাস।

দুদকের প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত তার বেতন-ভাতা বাবদ মোট আয় প্রায় ৩৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৮১ টাকা। অথচ অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, একই সময়ে তার নামে ও বেনামে প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পদ গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে বিপুল অঙ্কের লেনদেনও যাচাই করা হচ্ছে।

অভিযোগে রয়েছে—পিরোজপুরের নেছারাবাদে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ডুপ্লেক্স বাড়ি, বোনের নামে বাড়ি, বাবার নামে জমি, বসুন্ধরায় শ্যালকের নামে প্লট ও ভবন নির্মাণ, টয়োটা হ্যারিয়ার ব্যবহার, নিজেকে ভূমিহীন দেখিয়ে সরকারি জমি বন্দোবস্ত নেওয়াসহ একাধিক অভিযোগ। এসব অভিযোগ দুদকের অনুসন্ধানাধীন রয়েছে।

এছাড়া আয়কর রিটার্নে উল্লেখিত নগদ অর্থ, প্রাইজবন্ড, স্বর্ণ এবং স্ত্রী ফারজানা আক্তারের নামে থাকা সম্পদের তথ্যও যাচাই করছে সংস্থাটি।

আরও যেসব অভিযোগ আলোচনায় : বিভিন্ন সূত্রে পলাশ সিকদারের বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হয়নি।

এছাড়া উত্তরায় একটি জমিতে দুটি নকশা অনুমোদন দিয়ে ঘুষ গ্রহণ এবং শাজাহানপুর এলাকায় এক ডেভেলপারকে নকশা ছাড়াই ভবন নির্মাণে মৌখিক অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগেরও আনুষ্ঠানিক তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।

বক্তব্য ও বাস্তবতা : অভিযোগের বিষয়ে পূর্বে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে পলাশ সিকদার বলেছিলেন, “আমি সাধু নই, আপনি নিউজ করেন।” তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর নথি এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যাচাই শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, পলাশ সিকদারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশ বর্তমানে অনুসন্ধান বা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। এসব বিষয়ে এখনো কোনো আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি। তার পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে এবং তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

👁️ 86 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *