স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ‘ভাগ্নি জামাই’ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ  : বদলি-পদায়ন থেকে টেন্ডার—সবকিছুই কি নিয়ন্ত্রণে একটি বলয়?

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সারাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক :  বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। সরকারের পরিবর্তন হলেও স্বাস্থ্য প্রশাসনে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কার্যক্রম থেমে নেই—এমন অভিযোগই উঠে এসেছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের কাছ থেকে। অভিযোগ অনুযায়ী, বর্তমানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে উঠেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পার) মো. মুস্তাফিজুর রহমান। অভিযোগে বলা হচ্ছে, তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের আত্মীয় (ভাগ্নি জামাই) হওয়ায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছেন।


বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই বলয়ের নেতৃত্ব পর্যায়ে আরও রয়েছেন মন্ত্রীর এপিএস মোস্তাফিজুর রহমান, কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালক মোহাম্মদ শফিউর রহমান এবং মন্ত্রীর পিএস এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার। অভিযোগ অনুযায়ী, বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি এবং বিভিন্ন ক্রয় ও টেন্ডার কার্যক্রমে এই বলয়ের প্রভাব রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।

সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ  :  একাধিক সূত্রের ভাষ্য, যুগ্মসচিব (পার) মো. মুস্তাফিজুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সমন্বিত বলয় গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রীর এপিএস নিয়োগেও তাঁর সুপারিশ কার্যকর হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে সিএমএসডির পরিচালক মোহাম্মদ শফিউর রহমানকে ঘিরেও বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগ আমলের কর্মকর্তাদের পুনরুত্থানের অভিযোগ
স্বাস্থ্য প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময় প্রভাবশালী ছিলেন—এমন কয়েকজন কর্মকর্তা বর্তমান সময়েও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের কেউ কেউ অতীতের প্রভাব ব্যবহার করে আবারও প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়েছেন।

বদলি-পদায়ন ও পদোন্নতি ঘিরে অভিযোগ  :  মন্ত্রণালয়ের পার (প্রশাসন) শাখার দায়িত্বে থাকায় যুগ্মসচিব (পার)-এর মাধ্যমে বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির প্রায় সব প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য নথি এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি পদায়ন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার পর সেগুলোর কিছু বাতিলও হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগার ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ  :
অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রম সীমিত কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নির্দিষ্ট একটি প্রভাবশালী বলয়ের বাইরে বড় কোনো কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের এমএসআর (Medical & Surgical Requisites) সামগ্রী ক্রয়েও টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও যোগসাজশের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পুরোনো ঠিকাদারদের সক্রিয় থাকার দাবি  :  স্বাস্থ্যখাতে অতীতে আলোচিত কয়েকজন ঠিকাদার ও কর্মচারী এখনও বিভিন্নভাবে সক্রিয় রয়েছেন বলে দাবি করেছেন একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এসব ব্যক্তি এখনও বিভিন্ন সরকারি কাজ পাচ্ছেন।

অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্যখাতের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নিয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সেই তদন্তগুলোর অনেকগুলোরই কার্যকর পরিণতি হয়নি। এই দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ড্যাবের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি নিয়েও অভিযোগ  :  চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর অভ্যন্তরীণ বিভক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তবে এ বিষয়ে ড্যাব বা সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য  :  এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পার), মন্ত্রীর এপিএস, মন্ত্রীর পিএস এবং সিএমএসডির পরিচালকের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

উপসংহার  :  স্বাস্থ্যখাত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা খাত। এ খাতে বদলি-পদায়ন, সরকারি ক্রয়, টেন্ডার ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। তবে বর্তমানেও যদি একই ধরনের অভিযোগ অব্যাহত থাকে, তাহলে সেসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের।

👁️ 23 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *