
নরসিংদী প্রতিনিধি : নরসিংদীর সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত তথ্য-রাজনীতি।

অভিযোগ উঠেছে—ঘটনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সাবেক এক ইউনিয়ন সহ-সভাপতির নাম দ্রুত ও জোরালোভাবে প্রচার পেলেও, সরাসরি অপরাধে জড়িত এক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-সংশ্লিষ্ট কর্মীর বিষয়টি প্রথম দফায় তেমন গুরুত্ব পায়নি।
প্রশ্ন উঠছে—এটা কি কেবল সাংবাদিকতার সীমাবদ্ধতা, নাকি সচেতন বাছাই?

প্রথম ফ্রেম : ‘বিএনপি নেতা গ্রেফতার’—মধ্যরাতের ন্যারেটিভ : অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই কয়েকটি অনলাইন মাধ্যমে “বিএনপি নেতা গ্রেফতার” শিরোনামে ফটোকার্ড প্রকাশিত হয়। সেখানে জামায়াত সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রথম যে ফ্রেমটি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটি ছিল—“বিএনপি নেতা”। রাজনীতিতে প্রথম ফ্রেমই অনেক সময় শেষ ফ্রেম হয়ে যায়।

দ্বিতীয় ঢেউ, সংগঠিত শেয়ারিং বনাম সীমিত রিচ : রাতের ফটোকার্ড দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যাদের ফলোয়ার বেশি, তারা সেটিই শেয়ার করেন। ফলে বিএনপির নাম সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
অন্যদিকে, সকালে স্থানীয় এক সাংবাদিক মামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন—সেখানে ধর্ষণের অভিযোগে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মীর সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসে। কিন্তু সেই পোস্টের রিচ ছিল সীমিত। ফলে অধিকাংশ মানুষ দ্বিতীয় তথ্যটি দেখেননি। এখানেই তৈরি হয় তথ্যের বৈষম্য—যা সামাজিক উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে।
কেন এমন হলো ? মিডিয়ার শিরোনাম নির্ধারণ : দ্রুততা অনেক সময় পূর্ণতা কেড়ে নেয়। ডিজিটাল অ্যালগরিদমের বাস্তবতা: প্রথম ভাইরাল কনটেন্টই বেশি মানুষের সামনে যায়। এবং রাজনৈতিক ন্যারেটিভের প্রতিযোগিতা: প্রতিপক্ষের নাম জোরে বলা, নিজের সংশ্লিষ্টতা নীরব রাখা—এ কৌশল নতুন নয়।
তাহলে করণীয় কী ছিল ? যদি সত্যিই কেউ “সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার” চান, তাহলে— জনপ্রিয় নেতাকর্মীরা বিস্তারিত তথ্যসহ নিরপেক্ষ অবস্থান জানাতে পারতেন।
“দলীয় পরিচয় নয়, অপরাধই মুখ্য”—এই বার্তা জোরালো করা যেত। স্থানীয় সাংবাদিকের তথ্যসূত্র যাচাই করে বৃহত্তর প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরা যেত। রাজনীতির পরিপক্বতা প্রমাণ হয় তখনই, যখন নিজের ঘরের অস্বস্তিকর সত্যও স্বীকার করা যায়।
মূল প্রশ্ন : আমরা কি দল দেখে বিচার চাই, নাকি অপরাধ দেখে?
একজন অভিযুক্ত যদি বিএনপি-সংশ্লিষ্ট হন—তবে তার বিচার চাই। একজন অভিযুক্ত যদি জামায়াত-সংশ্লিষ্ট হন—তবুও তার বিচার চাই। আইনের চোখে দলীয় পরিচয় নয়, অপরাধই বিবেচ্য।
শেষ কথা : নরসিংদীর ঘটনা দেখাল—তথ্য কেবল কী ঘটেছে তা নয়, কীভাবে পরিবেশিত হয়েছে সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই নিজেদের নৈতিক উচ্চতায় রাখতে চায়, তাহলে তাদের উচিত— দলীয় পরিচয়ের আড়ালে নয়, অপরাধের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। কারণ জনগণ এখন আর শুধু শিরোনাম দেখে না—তারা পুরো গল্প জানতে চায়।
