
মো:রাসেল মোল্লা , রূপগঞ্জ, (নারায়ণগঞ্জ) : ঈদকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো, পূর্বাচল উপশহর, চনপাড়া, গোলাকান্দাইল, মুড়াপাড়া, কাঞ্চন, ইছাপুরা, গোয়ালপাড়া, লাভরাপাড়া, ঠাকুরবাড়িরটেক, গোলাকান্দাইল ৫নম্বর ক্যানেল, নোয়াপাড়া, হাটিপাড়াসহ আশাপাশের এলাকার তিন শতাধিক মাদকের স্পট সক্রিয়। এখানে মজুদ করা হচ্ছে মাদকদ্রব্য। সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপুর নির্দেশে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের অভিযানে দুই দফায় বিপুল পরিমাণ ফেন্সিডিল, গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৫মার্চ রবিবার রূপগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক হুমায়ূন আহমেদ, সহকারী উপ-পরিদর্শক আহসানউল্লাহ ও নাদিরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় এসপি, ওসি ও সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু প্রশংসিত হয়েছেন।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রে মাদকের স্পট রয়েছে একশ’র অধিক। এসব মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণে ৩০/৩২টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীর সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি। মাদকসেবীর সংখ্যা ২৫/৩০হাজার মানুষ। এদের তালিকায় শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিরা রয়েছে। ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের কারো কারো এ তালিকায় নাম আছে। বছরে এসব মাদকসেবীর অপচয় হয় বিপুল পরিমাণ টাকা।
সন্ধ্যার পরপরই মাদক ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। সুযোগ পেয়ে শিক্ষার্থী ও তরুণরাও মাদক সেবনে ঝুঁকছে। বর্তমানে নানা প্রতিকূলতায় মাদকবিরোধী অভিযান মুখ থুবড়ে পড়ছে। ইয়াবা আসক্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বহনে সহজলভ্য হওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীরাও ইয়াবা ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ছে।
রূপগঞ্জের সর্বত্রই যেন চলছে মাদকের রমরমা বাণিজ্য।

এখানে ভাংগাড়ি ব্যবসার অন্তরালে মাদক ব্যবসা চলে। উপজেলার গোলাকান্দাইল সাওঘাট এলাকার একটি পরিত্যাক্ত বিল্ডিংয়ের অভ্যন্তরে মাদক মজুদ করা হয়। গোলাকান্দাইল ৫নং ক্যানেল এলাকা, গোলাকান্দাইল উত্তরপাড়া বালুরমাঠ, কালী মজলিসের বাগ, মুসলিমপাড়া কাঁঠালবাগান, তারাবো পৌরসভার হাটিপাড়া, নোয়াপাড়া, বরাবো, কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নগরপাড়া, বাগবাড়ী, দেলপাড়া, নয়ামাটি, কামশাইর, বরুণা এলাকা রীতিমতো মাদকের ডিপো করা হয়েছে।

রূপগঞ্জ ইউনিয়নের গোয়ালপাড়া ও পূর্বাচল উপশহরে মাদকের সয়লাব। রাতালদিয়া, সাওঘাট, পূর্ব দরিকান্দি, মাছিমপুর, রূপসী স্লুইসগেট, কালাদি, আতলাশপুর, হাটাবো টেকপাড়া, গন্ধর্বপুর, দক্ষিণ মাসাবোসহ আরও অনেক এলাকায় মাদকের ব্যবসা এখন জমজমাট। এদের মধ্যে কেউ ইয়াবা, কেউ ফেন্সিডিল, কেউ হেরোইন আবার কেউবা গাঁজার ব্যবসায়ী। তারাবো দক্ষিণপাড়ার নবী হোসেন, নাজমুল, রাসেল, তারাবো উত্তরপাড়ার মানিক, রিফাত, বিল্লাল ও ইমন অবাধে মাদক ব্যবসা করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রূপগঞ্জের চনপাড়া যেন দুর্ভেদ্য মাদক সা¤্রাজ্য। সিন্ডিকেটের কয়েকশ’ নারী সরাসরি এ ব্যবসায় জড়িত। কখনও মাদক ব্যবসায় ব্যবহার করা হচ্ছে বেদে বহর, কখনও লবণবাহী সাম্পান আবার সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী কার্গো জাহাজ।
মাদকের কালো ছায়ায় অন্ধকার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। অল্প সময়ে ধনী হওয়ার আশায় অনেক তরুণ ও নারীও এ পেশায় ঝুঁকছেন। মাদক বহনে টোকাই ও শিশু-কিশোরদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে। মরণ নেশা গাঁজা, হেরোইন, ইয়াবা, ফেন্সিডিল, ফেন্সিডিলের বিকল্প হিসেবে স্কাফ, আইসপিল, টিডিজেসিক ও লুপিজেসিক ইঞ্জেকশনসহ নানা ধরণের মাদকদ্রব্যে এখন হাতের নাগালেই।
এছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে আধুরিয়া পর্যন্ত ছোট-বড় প্রায় ৫ শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব শিল্পকারখানায় রয়েছে কয়েক লাখ শ্রমিক। এদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এসব শ্রমিকদের অধিকাংশ বহিরাগত। এরা ছোট ছোট খুপরি ঘরে কিংবা মেস ভাড়া করে ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করছে। এসব খুপরি ঘরে মাদক ব্যবসায়ীরা ফেরি করে মাদকদ্রব্য সরবরাহ করছে।
সড়ক ও নৌপথে এলাকায় অবাধে মাদকদ্রব্য আসে। মাদক প্রবেশের সবচেয়ে নিরাপদ রুট হচ্ছে বালু নদ। এ নদে পুলিশ টহলের ব্যবস্থা না থাকায় মাদকব্যবসায়ীরা নির্বিঘেœ ইঞ্জিনচালিত ট্রলারযোগে মাদক নিয়ে আসে। এছাড়া শীতলক্ষ্যা নদী পথে পণ্যবাহী জাহাজে করে মাদক আসে রূপগঞ্জে। সেইসঙ্গে এশিয়ান হাইওয়ে দিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে কুমিল্লা ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া থেকে মাদক আসে রূপগঞ্জে।
আশুগঞ্জ-ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হয়ে মাদক আসে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা হচ্ছে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট। আখাউড়া, কুমিল্লা, সিলেট ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া থেকে মাদক বাস, নাইট কোচ, সংবাদপত্র বহনকারী মোটরসাইকেল কিংবা ট্রাকযোগে ওই এলাকায় মাদক আসে।
চনপাড়া বস্তিতে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের বসবাস। এখানে মাদক বেচাকেনা চলে প্রকাশ্যে। প্রতি সন্ধ্যায় এই বস্তিতে বসে মাদকের হাট। শুরু হয় কোলাহল।
এ রমরমা আসর চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এখানে ফেরি করে বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি করা হয়। রাজধানীর ডেমরা, সারুলিয়া, যাত্রাবাড়ীসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মানুষ চনপাড়া বস্তিতে আসে মাদক সেবন করতে। এখানে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঘটেছে হত্যাকান্ডের ঘটনাও।
স্থানীয় প্রশাসন এখানকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিতে বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে। মাদকের হাটখ্যাত চনপাড়া বস্তি থেকে থানা রুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও প্রভাবশালীরা নিয়মিত বখরা পায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযানে উদ্ধারও হচ্ছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। গ্রেফতার করা হচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীদের। আইনের ফাঁকফোকরে জামিনে এসেই আবারো মেতে উঠে এ ব্যবসায়।
ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর মোহনায় চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র। চনপাড়ায় প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ রয়েছে অনেক। একদিকে পুলিশ প্রবেশ করলে মাদকসেবীরা অন্য পথে বের হয়ে যায়। এখানে দিনমজুর, ঠেলাগাড়িচালক, রিকশাচালক, ফেরিওয়ালা, গার্মেন্ট শ্রমিকের পাশাপাশি পেশাদার খুনি, ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা বাস করে। তাদের অনেকেই মাদক ব্যবসায় জড়িত।
মাদকের বিষাক্ত ছোবলে রূপগঞ্জের হাজার হাজার তরুণের জীবন বিপন্ন। মাদকের টাকা জোগাড় করতে তারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও খুনসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকসংক্রান্ত দ্বন্দ্বে খুনের ঘটনা তো রয়েছেই।
মাদকের ঘটনায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চুনোপুঁটিরা ধরা পড়লেও রাঘব-বোয়ালরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে পুলিশের সঙ্গে মতের অমিল হলেই চলে লোক দেখানো অভিযান। অভিযানের খবর পেয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা নিরাপদে চলে যায়।
পুলিশের অভিযান ব্যর্থ হয়। মাদক ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে মাদক বহন করে থাকেন। ইয়াবা ও ফেনসিডিল বহন করা হয় লাউ, নারিকেল আর ম্যাচের বাক্সের ভেতরে করে। হেরোইন বহন করা হয় মিষ্টির প্যাকেটের ভেতরে। আর গাঁজা বহন করা হয় ছালার চটের ভেতরে করে। মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করা হয় টোকাই ও শিশু-কিশোরদের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু, কিশোর ও মহিলাদের দিয়ে মাদক বহন করা হয়। মহিলাদের স্পর্শকাতর জায়গায় রেখে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজা বহন করা হয়।
রূপগঞ্জ থানা পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত একযুগে নেশার কাজে বাধা দেয়া ও প্রতিবাদ করায় ২০/২২ জন খুন হয়েছেন। ২০২০ সালে কায়েতপাড়া এলাকায় মাদকের দ্বন্দ্বে খুন হন আনোয়ার হোসেন। একই বছর শিংলাবো এলাকায় মাদক সেবনে বাধা দেয়ায় ছেলে সাইফুল ইসলামের হাতে মা দেলোয়ারা বেগম নিহত হন। রূপসী কাজীপাড়া এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে খুন হন রাজন মিয়া। মাদক সেবন করেও গত কয়েক বছরে মারা গেছেন ৪/৫ জন।
রূপগঞ্জের তারাবো পৌরসভা মাদক বিরোধী কমিটির আহবায়ক আলহাজ্ব মোজাম্মেল হক প্রধান বলেন, মাদক সমাজের ব্যাধি। মাদক প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। মাদকাসক্তি সমাজ থেকে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ নষ্ট করে অপরাধ বাড়িয়ে সুষ্ঠু ও সামাজিক পরিবেশ নষ্ট করছে। তাই মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে প্রত্যেকেই আরো সচেতন হতে হবে। প্রশাসনকে সহযোগীতা করতে হবে।
রূপগঞ্জ থানার ওসি মোহাম্মদ সবজেল হোসেন বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলে। রূপগঞ্জে অনেক দুর্গম ও চনপাড়া বস্তি এলাকাটা ঘিঞ্জি। টের পেয়ে পুলিশ ঢোকার আগেই মাদক কারবারিরা নিরাপদে পালিয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা কোনো দলের না। তারা দেশ ও জাতির শত্রু। মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে পুলিশ তৎপর রয়েছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৫মার্চ রবিবার রূপগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক হুমায়ূন আহমেদ, সহকারী উপ-পরিদর্শক আহসানউল্লাহ ও নাদিরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, মাদক ব্যবসা ও সেবন নির্মূলে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও কাজ করছে। শিগগিরই মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সফলতা আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নারায়ণগঞ্জ-১(রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা যত প্রভাবশালীই হোক ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমার কিংবা রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। নেতাকর্মীদের কেউ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলে দল থেকে বর্হিষ্কার করে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
