
নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালকের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে করা একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হাসপাতালের বাথরুম, টয়লেট ও ভবনের অভ্যন্তরীণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব সাংবাদিকদের ওপর দেওয়ার প্রস্তাব করে একটি পোস্ট প্রকাশ করেন, যা সাংবাদিক সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
পোস্টে তিনি লিখেছেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা করে তথ্য মন্ত্রণালয় এবং সাংবাদিকদের দেশের ৬০০ জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের বাথরুম, টয়লেট ও অভ্যন্তরীণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব অন্তত এক অর্থবছরের জন্য দেওয়া উচিত। এমনকি এ কাজে সফল হলে স্থায়ীভাবে সেই দায়িত্ব দেওয়ারও প্রস্তাব করেন তিনি।
পেশাজীবী সমাজকে অবমাননার অভিযোগ : সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাকে উদ্দেশ্য করে এমন মন্তব্য কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার শামিল।

তাদের ভাষ্য, সাংবাদিকদের কাজ হলো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুসন্ধান, দুর্নীতি ও অনিয়ম উন্মোচন এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সেই পেশাকে বিদ্রূপ করে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দায়িত্বের সঙ্গে তুলনা করা একটি দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়।

বিজ্ঞাপন
সমালোচকদের প্রশ্ন: সমালোচনা সহ্য করতে না পারার বহিঃপ্রকাশ ? বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, হাসপাতালের নাজুক পরিবেশ ও রোগীসেবার নানা সংকট নিয়ে গণমাধ্যম ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে কোনো সরকারি কর্মকর্তার পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে কটাক্ষমূলক বক্তব্য দেওয়া সমালোচনা সহ্য করতে না পারার প্রবণতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অনেকের প্রশ্ন, হাসপাতালের বাথরুম ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাংগঠনিক দায়িত্ব। সেই ব্যর্থতার দায় সাংবাদিকদের ওপর চাপানোর চেষ্টা কতটা যৌক্তিক?
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম দায়িত্বশীলতা : সরকারি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলেও তাদের বক্তব্য জনপরিসরে প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যে সংযম, পেশাগত শালীনতা ও দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া কোনো মন্তব্য যদি একটি পেশাজীবী সম্প্রদায়কে হেয়, অপমান বা বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে, তবে তা প্রশাসনিক আচরণবিধি ও পেশাগত নৈতিকতার প্রশ্নও উত্থাপন করতে পারে।

সাংবাদিকদের ভূমিকা রাষ্ট্রের জবাবদিহিতায় : সাংবাদিকরা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবার সংকট, জনদুর্ভোগ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা তাদের সাংবিধানিক ও পেশাগত দায়িত্ব।
সেই পেশাকে অবমাননাকর ভাষায় উপস্থাপন করা শুধু সাংবাদিকদের নয়, তথ্য জানার জনগণের অধিকারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে বলে মনে করেন গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা।
সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া : বিতর্কিত এই পোস্ট প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, মতবিরোধ থাকতে পারে, সমালোচনাও থাকতে পারে; কিন্তু কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠীকে হেয় করে বক্তব্য দেওয়া একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার আচরণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
উপসংহার : স্বাস্থ্যখাতের সংকট, হাসপাতালের নোংরা পরিবেশ কিংবা সেবাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু সেই প্রশ্নের জবাব যদি সমালোচকদের অপমানের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তবে তা সমস্যার সমাধান নয়; বরং নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মতো গণমাধ্যমও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্যে শালীনতা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক সম্মানের চর্চাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম পূর্বশর্ত।
