মিরপুরে শতকোটি টাকার সরকারি জমি দখলের অভিযোগ  :  আদালতে মামলা চললেও থামেনি নির্মাণ, সানভিউ টাওয়ার্সকে ঘিরে নতুন বিতর্ক !  

Uncategorized অনিয়ম-দুর্নীতি অপরাধ আইন ও আদালত কর্পোরেট সংবাদ জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক  :  রাজধানীর মিরপুরে শতকোটি টাকার সরকারি জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সানভিউ টাওয়ার্স নামের একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান।


বিজ্ঞাপন

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দাবি, সরকারের অধিগ্রহণ করা জমি নিজেদের মালিকানাধীন বলে দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকলেও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মিরপুরের পল্লবী থানাধীন বাউনিয়া মৌজায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অধিগ্রহণকৃত জমির একটি অংশকে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।


বিজ্ঞাপন

গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সিএস ৩১২৪ ও সিএস ৩১২৮ দাগভুক্ত প্রায় তিন একর জমি সানভিউ টাওয়ার্সের দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই জমির ওপর ইতোমধ্যে একটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং নতুন আরেকটি ভবনের কাজও এগিয়ে চলছে।


বিজ্ঞাপন

সরকারি জমিতে ব্যক্তিমালিকানার দাবি  :  জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দাবি, সংশ্লিষ্ট জমি সরকার আইনানুগভাবে অধিগ্রহণ করে তাদের আওতায় নিয়েছে। কিন্তু সানভিউ টাওয়ার্সের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা সাগুফতা কোম্পানির মালিক জুয়েল মোল্লার কাছ থেকে ২০২২ সালে বৈধভাবে জমিটি ক্রয় করেছে এবং সেই ভিত্তিতেই নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে।

তবে সরকারি সংস্থাটির অভিযোগ, জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় এবং বিরোধ নিষ্পত্তির আগেই ভবন নির্মাণ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তাদের দাবি, সরকারি জমির ওপর প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই এবং অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণকাজ পরিচালিত হচ্ছে।

অভিযান, ভাঙচুর, তবুও বন্ধ হয়নি কাজ  :  অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ নির্মাণের বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চিঠির পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে ভবনের কিছু অংশ অপসারণ করা হলেও পুরো নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিযানের পর সানভিউ টাওয়ার্সের কর্মকর্তারা রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে এ ঘটনায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাব খাটানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

রেকর্ডের পাতা ছেঁড়া, প্রশ্নে জমির ইতিহাস  :  জমি বিরোধকে ঘিরে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। জানা গেছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সংরক্ষিত পুরোনো রেকর্ডের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া গেছে, যেখানে অধিগ্রহণ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকার কথা ছিল।

এ ঘটনায় জমির মালিকানা ও রেকর্ড সংরক্ষণ প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথির এ ধরনের অবস্থা তদন্তের দাবি রাখে।

ভুয়া কাগজপত্রে সরকারি জমি দখল’  :  জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন হিসেবে দেখাতে কিছু প্রতিষ্ঠান ভুয়া কিংবা বিতর্কিত কাগজপত্র ব্যবহার করছে।

তাদের দাবি, সানভিউ টাওয়ার্সসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিএস দাগের জমি ব্যবহার করে সরকারি সম্পত্তির ওপর ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, মডেল মসজিদ নির্মাণের জন্য নির্ধারিত সরকারি জায়গার একটি অংশও দখলের আওতায় চলে গেছে। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি সরকারি পরিকল্পনার অংশ ছিল, কিন্তু বর্তমানে সেখানে দখলসংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিয়েছে।

শতকোটি টাকার জমি ঘিরে সংঘাত  :  মিরপুর এলাকার জমির বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় তিন একর জমির মূল্য শতকোটি টাকারও বেশি হতে পারে। ফলে জমিটির নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিরোধ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জাতীয় গৃহায়নের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারিজুর রহমান বলেন, “সানভিউ যে জায়গায় ভবন নির্মাণ করছে সেটি গৃহায়নের অধিগ্রহণ করা জমি। জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা রয়েছে। তারপরও নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।” জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, “সরকারি জমি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দখল করতে দেওয়া হবে না। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অবৈধ নির্মাণ বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”

 

অভিযোগ অস্বীকার সানভিউর  :  অন্যদিকে সানভিউ টাওয়ার্সের সভাপতি সাইফুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বৈধভাবে জমি ক্রয় করেছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, ভবনের কিছু অংশ অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মিত হওয়ায় রাজউক ব্যবস্থা নিয়েছে।

তদন্ত ও পদক্ষেপের দাবি  বর্তমানে সরকারি জমির মালিকানা, নির্মাণ অনুমোদন এবং ভবন নির্মাণের বৈধতা নিয়ে সানভিউ টাওয়ার্স ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিরোধ চলমান রয়েছে। আদালতে মামলা, জমির রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন, অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণ এবং সরকারি সম্পত্তি দখলের অভিযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, শতকোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ এবং অবৈধ দখলের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে আদালতের নিষ্পত্তির আগ পর্যন্ত বিতর্কিত স্থাপনায় নতুন নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার দাবিও জোরালো হচ্ছে।

👁️ 25 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *