রাজনীতির আবর্তে ব্যাংকিং খাত : সংকট মোকাবেলালার পথরেখা

Uncategorized অর্থনীতি কর্পোরেট সংবাদ জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সারাদেশ

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান  :  একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির হৃৎপিণ্ড হলো তার আর্থিক খাত, যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে ব্যাংকিং ব্যবস্থা। তবে যখন কোনো উদীয়মান অর্থনীতির ব্যাংকিং খাত পেশাদারিত্বের বলয় ছিন্ন করে রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোর আবর্তে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তা কেবল সাধারণ কোনো আর্থিক অনিয়ম বা ‘হোয়াইট কলার ক্রাইম’ (White-collar crime)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।


বিজ্ঞাপন

অপরাধবিজ্ঞানের (Criminology) প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক কাঠামোতে এটি মূলত ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধের তত্ত্ব’ (Theory of State Crime) এবং ‘নিয়ন্ত্রক ক্যাপচার’ (Regulatory Capture)-এর এক ধ্রুপদী ও নগ্ন দৃষ্টান্ত। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিক স্বার্থ সুরক্ষার আইনি ম্যান্ডেট ভুলে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা শ্রেণীর স্বার্থে আর্থিক লুণ্ঠনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, তখন তা অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় ‘রাষ্ট্র-করপোরেট আঁতাত’ (State-Corporate Symbiosis) হিসেবে চিহ্নিত হয়।

বর্তমান উন্নয়নশীল বিশ্বে এবং বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে, ব্যাংকিং সেক্টরের এই রাজনৈতিকীকরণ একটি কাঠামোগত ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে, যা পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


বিজ্ঞাপন

ফ্যাসিবাদের আবর্তে ব্যাংকিং খাত: ক্রাইমিনোজেনিক এনভায়রনমেন্ট (Criminogenic Environment)  : অপরাধবিজ্ঞানী উইলিয়াম চ্যাম্বলিস (William Chambliss) বা পেনি গ্রিন (Penny Green)-এর ‘স্টেট ক্রাইম’ বা রাষ্ট্রীয় অপরাধের তাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী, রাষ্ট্র যখন নিজের প্রণীত আইন লঙ্ঘন করে অথবা নিজস্ব ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে ব্যাপক জনস্বার্থবিরোধী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ তৈরি করে বা তা প্রশ্রয় দেয়, সেটাই রাষ্ট্রীয় অপরাধ।


বিজ্ঞাপন

বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলের ব্যাংকিং খাতকে যদি আমরা অপরাধবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক লেন্স দিয়ে বিশ্লেষণ করি, তবে সেখানে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ক্রাইমিনোজেনিক এনভায়রনমেন্ট’ (Criminogenic Environment) বা অপরাধপ্রবণ পরিবেশের নিখুঁত অবয়ব দৃশ্যমান হয়। এই পরিবেশের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:

পদ্ধতিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিকীভুত অপরাধ (Systemic & Institutionalized Crime): বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদের মূল ভিত্তিই ছিল আর্থিক লুণ্ঠনের মাধ্যমে একটি অনুগত ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বা ‘অলিগার্কি’ (Oligarchy) তৈরি করা। ব্যাংকিং খাতকে এই অলিগার্কদের অর্থায়নের প্রধান উৎসে পরিণত করা হয়েছিল। রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স অনুমোদন, একক পরিবারের জন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সীমাহীন আইনি সুবিধা নিশ্চিত করা এবং দৃশ্যমান কোনো জামানত বা সঠিক মূল্যায়ন ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন—কোনোটিই বিচ্ছিন্ন অপরাধ ছিল না। এগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক লুণ্ঠনকে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ার সুপরিকল্পিত ফ্যাসিবাদী প্রক্রিয়া।

বলপ্রয়োগ ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে ব্যাংক দখল  :  (Forced Hostile Takeovers): অপরাধবিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘স্টেট-স্পনসর্ড ক্রাইম’-এর অন্যতম ন্যাক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল যখন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে গভীর রাতে বন্দুকের মুখে একের পর এক বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের (যেমন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডসহ একাধিক শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক) পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন ও জোরপূর্বক দখল করা হয়েছিল। এটি ছিল কর্পোরেট ইতিহাসের এক চরম অপরাধমূলক অধ্যায়, যা একটি ফ্যাসিবাদের প্রত্যক্ষ মদদ ছাড়া অসম্ভব।

রেগুলেটরি ক্যাপচার (Regulatory Capture): রাষ্ট্র ও তার নিয়ন্ত্রক সংস্থা যখন কোনো ক্ষমতাশালী লবিস্ট বা নির্দিষ্ট অপরাধী চক্রের স্বার্থে কাজ করে, তখন রেগুলেটর নিজেই অপরাধের সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়। বিগত আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এমনভাবে ‘ক্যাপচার’ বা জিম্মি করা হয়েছিল যে, বড় বড় খেলাপিদের জন্য দফায় দফায় ডাউনপেমেন্টের নিয়ম শিথিল করা, বেনামী ঋণ গোপন করা এবং ব্যাংক থেকে বিদেশে অর্থ পাচারের পথকে মসৃণ করতে নিয়মনীতি তৈরি করাই যেন ছিল এর প্রধান কাজ।

ফাঁপা অবয়ব ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক অভিঘাত: বিশ্বব্যাংক ও এডিবির উপাত্ত  :  সেই ফ্যাসিবাদের তৈরি করা ক্ষত ও ক্রাইমিনোজেনিক এনভায়রনমেন্টের খেসারত আজ পুরো অর্থনীতিকে দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিকতম মূল্যায়ন ও পরিসংখ্যানগুলো রাষ্ট্রীয় অপরাধ ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞের এই তাত্ত্বিক সত্যকেই সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে প্রমান করে:

বিশ্বব্যাংকের কঠোর মূল্যায়ন ও ঋণ প্যাকেজ: বিশ্বব্যাংকের কার্যনির্বাহী পরিচালক পর্ষদের অনুমোদন (জুন ২০২৬) অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, এ দেশের ব্যাংকিং খাত দুর্বল করপোরেট গভর্নেন্স, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষকে অনৈতিক ঋণ প্রদানের (Related-party lending) মতো তীব্র কাঠামোগত সংকটে জর্জরিত। এই সংকট উত্তরণে সংস্থাটি $৪৫০ মিলিয়ন ডলারের ‘আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্প-২’ (FSSP II) অনুমোদন করতে বাধ্য হয়েছে।

পাহাড়সম খেলাপি ঋণ (NPL): বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের মার্চ মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে অভাবনীয় ৩২.৬ শতাংশে। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের গড় খেলাপি ঋণ মাত্র ৭.৯ শতাংশ, সেখানে এই বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে যে ঋণ বিতরণ ও আদায় ব্যবস্থা দীর্ঘদিন যাবৎ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আঁতাত ও অপরাধমূলক প্রশ্রয়ের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়েছে।

মূলধন ও তারল্য পতন: বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিশিয়াল ডেটার বরাত দিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সামগ্রিক ঝুঁকি-ভিত্তিক মূলধন অনুপাত বা ‘ক্যাপিটাল-টু-রিক্স-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও’ (CRAR) নেমে গেছে ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেখানে এই অনুপাত ১৭ শতাংশের ওপরে, সেখানে ঋণাত্মক মূলধন অনুপাত ব্যাংকিং খাতের ভেতরের গভীর ফাঁপা অবয়ব ও তারল্য সংকটকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে।

এডিবির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস হ্রাস: এই ব্যাংকিং সংকটের তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের জুলাই ২০২৬-এর আউটলুকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪.৫ শতাংশে নামিয়েছে। উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে, যা উৎপাদনশীল খাতে বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে কর্মসংস্থানে স্থবিরতা ডেকে এনেছে।

আইনি সংস্কার বনাম দায়মুক্তির সংস্কৃতি: টিআইবি’র হুঁশিয়ারি :  আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশ্লেষণ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি বড় ক্ষেত্র হলো আইনি কাঠামোর ভেতরের ফাঁকফোকর বা লুপহোল তৈরি করে অপরাধীদের সুরক্ষা দেওয়া। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে প্রণীত “банк রেজুলেশন অ্যাক্ট, ২০২৬” এর ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছে, যা সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।

লুটেরাদের পুনর্বাসনের আইনি বৈধতা : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) তাদের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্ট, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারাটি মূলত চিহ্নিত ব্যাংক লুটেরাদের কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়াই মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে。

Impunity বা দায়মুক্তির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করেছেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫’-এ ব্যাংক ধ্বসের জন্য দায়ীদের মালিকানায় ফেরার পথ কঠোরভাবে রুদ্ধ করা হলেও, ২০২৬ সালের নতুন আইনে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাত আবারও লুণ্ঠন ও দুর্নীতির অভয়ারণ্যে (Haven for corruption and plunder) পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, যা পুরো আর্থিক খাতের সংস্কারচেষ্টাকে ‘আত্মঘাতী’ (Self-defeating) করে তুলবে।

নির্দিষ্ট কোনো ক্ষমতাশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী (যেমন এস আলম গ্রুপ বা বেক্সিমকো) কর্তৃক জনগণের আমানতকে ব্যক্তিগত তহবিলের মতো ব্যবহার করা এবং পরবর্তীতে নামমাত্র শর্তে তা পুনরায় ফিরে পাওয়ার আইনি আয়োজন মূলত ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধের’ মাধ্যমে অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়ার চরম বহিঃপ্রকাশ।

সংকট মোকাবেলার পথরেখা: কাঠামোগত পুনর্গঠন  : রাজনীতির আবর্তে এবং রাষ্ট্রীয় অপরাধের জালে নিমজ্জিত এই ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলতে হলে কেবল তাত্ত্বিক সংস্কার প্রস্তাব বা বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে নতুন ঋণ নেওয়া যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট, কঠোর এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ‘কৌশলগত রোডম্যাপ’। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক অনুমোদিত $৪৫০ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্প (FSSP II) এবং এডিবির পলিসি লোন-এর মূল উদ্দেশ্যগুলোকে সমন্বিত করে একটি কার্যকর সমাধান পথরেখা নিচে প্রস্তাব করা হলো:

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ‘ডি-পলিটিসাইজেশন’ ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন  : সংকটের মূল উপশম লুকিয়ে আছে রেগুলেটরের স্বাধীনতার মধ্যে। বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করার আইনি ও ব্যবহারিক স্বাধীনতা দিতে হবে। গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of interest) এড়িয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, পেশাদার ও যোগ্য ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেওয়া উচিত, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’-এর ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে অনৈতিক ঋণ ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগী খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।

আইনগত দায়মুক্তি সংস্কৃতির অবসান  :  টিআইবি-র প্রস্তাবনার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে, ‘ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্ট, ২০২৬’ এর বিতর্কিত ১৮(ক) ধারাটি দ্রুত বাতিল বা সংশোধন করতে হবে। ফ্যাসিস্ট আমলের কোনো অপরাধী বা খেলাপি পরিচালক যেন ছদ্মনামে বা কোনো বিশেষ সুযোগে পুনরায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এসে মালিকানা ফিরে না পায়, তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আইনকে কোনোভাবেই অপরাধী পুনর্বাসনের হাতিয়ার করা যাবে না।

ফরেনসিক অডিট এবং অ্যাসেট রিকভারি  :  সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর (যেমন সাম্প্রতিক সময়ে একীভূত হওয়া ইসলামি ধারার ব্যাংকসমূহ) জন্য চলমান বিশেষ ফরেনসিক অডিট আরও জোরদার করতে হবে। ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্টের ৫৭ ধারা অনুযায়ী, ব্যাংক লুণ্ঠন ও অর্থ পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের দেশী-বিদেশী সম্পদ ক্রোক ও আন্তর্জাতিক আইন সংস্থার মাধ্যমে তা নিলামের ব্যবস্থা করে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে।

আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ট্রাস্ট পুনরুদ্ধার  : ছোট আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে ‘আমানত সুরক্ষা তহবিল’ (Deposit Protection Fund)-এর মূলধন বাড়াতে হবে। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে আমানত সুরক্ষার সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকায় উন্নীত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক হলেও বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে এই সীমাকে পর্যায়ক্রমে আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

উপসংহার  :  অর্থনৈতিক অপরাধবিজ্ঞানের (Economic Criminology) দৃষ্টিতে, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা বা সাময়িক তারল্য সংকট নয়, বরং এটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের তৈরি করা ‘ক্রাইমিনোজেনিক এনভায়রনমেন্ট’ বা অপরাধপ্রবণ পরিবেশের ধারাবাহিক পরিণতি। রাজনীতির আবর্ত এবং ফ্যাসিবাদের সেই অশুভ ছায়া থেকে ব্যাংকিং খাতকে মুক্ত করতে না পারলে বিশ্বব্যাংক বা এডিবির শত কোটি ডলারের ঋণ সহায়তাও এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে না।

একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের যে স্বপ্ন বাংলাদেশ দেখছে, তার প্রধান এবং অবিকল্প পূর্বশর্ত হলো একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আর্থিক খাত। এখন সিদ্ধান্ত বর্তমান রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারক নেতৃত্বের—তারা কি ক্ষমতার ক্ষণস্থায়ী সুবিধার্থে ক্রাটোক্রেসির এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রীয় অপরাধের সংস্কৃতি জারি রাখবেন, নাকি দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে ব্যাংকিং খাতকে খাঁচামুক্ত করে একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ ‘অর্থনৈতিক পথরেখা’ নির্মাণ করবেন ? (লেখকঃ – প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।)

👁️ 22 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *