
নিজস্ব প্রতিবেদক : জালিয়াতি, তথ্য গোপন, একই সময়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি, নিয়মবহির্ভূতভাবে একাধিক দায়িত্ব পালনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা ওয়াসার ২ নম্বর জোনের রাজস্ব কর্মকর্তা এএমএম ইকরামের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে তিনি একের পর এক বিতর্কিত সুবিধা নিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মহলে তার কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ঢাকা ওয়াসার প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়েও।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় তথ্য গোপন করে নোয়াখালী পৌরসভার সচিব পদে যোগ দেন এএমএম ইকরাম।
প্রায় ৯ বছর একই সময়ে দুই প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি ধরা পড়ার পর ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অনিয়মের বিষয়গুলো উঠে এলেও তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে লঘু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

দুই প্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিযোগ : সূত্র জানায়, ২০০১ সালের ৯ অক্টোবর ঢাকা ওয়াসায় উচ্চমান সহকারী (ইউডিএ) পদে যোগ দেন এএমএম ইকরাম। কর্মজীবনের শুরুতে তাকে ঢাকা ওয়াসার বোতলজাত পানি উৎপাদন প্ল্যান্টে তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা ওয়াসায় চাকরিরত অবস্থায় বিজ্ঞপ্তি দেখে নোয়াখালী পৌরসভার সচিব পদে আবেদন করেন তিনি। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৫ সালের ৭ জুন ওই পদে যোগদান করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় তিনি একই সঙ্গে ঢাকা ওয়াসা ও নোয়াখালী পৌরসভায় দায়িত্ব পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অনেক সময় তিনি নিজে পৌরসভায় উপস্থিত হতে না পারলে তার মনোনীত একজন ব্যক্তি সেখানে দায়িত্ব পালন করতেন। এভাবে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি বেতন গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের পর সাময়িক বরখাস্ত, তদন্তে উঠে আসে তথ্য
২০১৪ সালে ঢাকা ওয়াসায় ইকরামের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে।
অভিযোগে বলা হয়, তিনি একই সময়ে নোয়াখালী পৌরসভায় সচিব হিসেবে কর্মরত থেকে বেতন গ্রহণ করছেন। এরপর ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে দুই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার বিষয়টি উঠে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ঢাকা ওয়াসার প্রশাসন শাখার কর্মকর্তারা জানান, সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিমালা-১৯৭৯ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী একই সময়ে একাধিক সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকতে পারেন না। এ ধরনের ঘটনা গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এএমএম ইকরামের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তার বেতন স্কেল ৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং নোয়াখালী পৌরসভার চাকরি ছাড়ার শর্ত দেওয়া হয়। পরে তিনি পৌরসভার চাকরি ছেড়ে ঢাকা ওয়াসায় বহাল থাকেন।
পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন : তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ওয়াসায় তাকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা ২০১৩ সাল থেকে কার্যকর দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি তাকে রাজস্ব কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ঢাকা ওয়াসায় একই সময়ে নিয়োগ পাওয়া ৩২ জন উচ্চমান সহকারীর মধ্যে ইকরামের জ্যেষ্ঠতার অবস্থান ছিল ২৬ নম্বরে। তার আগে থাকা ২৫ জনের কেউ প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পাননি। এ কারণে তার পদোন্নতি নিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে তিনি উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (ডিসিআরও) পদে পদোন্নতির জন্য তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও তার যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রেষণ ছাড়া প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের অভিযোগ : এএমএম ইকরামের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা ওয়াসায় কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রেষণ ছাড়াই পিপিআই প্রকল্পে ফিল্ড সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। অভিযোগকারীদের দাবি, একই সময়ে ঢাকা ওয়াসা ও প্রকল্প—দুই জায়গা থেকেই তিনি আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
স্বজনদের নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, এএমএম ইকরামের স্ত্রী সালমা আক্তার মিনা ঢাকা ওয়াসার পিএন্ডডি সার্কেলে পিএ কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে মাস্টাররোলে কর্মরত আছেন। এছাড়া তার স্ত্রীসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের ঢাকা ওয়াসায় আউটসোর্সিং ও মাস্টাররোলে নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত বন্ধে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ : সহকর্মীদের কয়েকজন ঢাকা ওয়াসা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি : এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এএমএম ইকরামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
