গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর না পেরোতেই ‘পুরোনো বয়ান’ ফের গণমাধ্যমে  ?  হাসিনা আমলের ন্যারেটিভ উৎপাদনকারীদের টকশো-দাপট নিয়ে প্রশ্ন, ব্যবসায়ী-মিডিয়া সংযোগের অভিযোগ

Uncategorized অপরাধ আইন ও আদালত জাতীয় ঢাকা বিশেষ প্রতিবেদন রাজধানী রাজনীতি সংগঠন সংবাদ সারাদেশ

বিশেষ প্রতিবেদক  :  গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দুই বছরও পূর্ণ হয়নি। এরই মধ্যে গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এমন কিছু ব্যক্তি, যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে জনমত তৈরির অভিযোগ ছিল। টেলিভিশন টকশো থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় তাদের উপস্থিতি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় কি পুরোনো


বিজ্ঞাপন

ন্যারেটিভই নতুন মোড়কে ফিরে আসছে ? গত ১৭ বছর ধরে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও নাগরিকদের একটি অংশের অভিযোগ, সে সময় তারা দমন-পীড়ন, মামলা, হয়রানি ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে ছিলেন। তাদের ভাষ্য, সেই সময়ে গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রতি ন্যূনতম ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দেখাতেও অনাগ্রহী ছিল। ফলে গণঅভ্যুত্থানের পর তারা প্রত্যাশা করেছিলেন, রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের কাঠামোতে সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটবে।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তাদের সেই প্রত্যাশায় ভাটা পড়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার বিতর্কিত রাজনৈতিক বয়ানকে প্রতিষ্ঠা দিতে সক্রিয় ছিলেন—এমন কয়েকজন বিশ্লেষক ও কলামিস্ট আবারও নিয়মিত টকশো ও গণমাধ্যমের আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে মনজুর পান্না, মহসিন রশীদ, আবু হেনা রাজ্জাকী, মাহবুব আজিজ ও মাহবুব কামালের নাম সামনে এসেছে।


বিজ্ঞাপন

সমালোচকদের অভিযোগ, এসব আলোচনায় আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামল, দমন-পীড়ন এবং গণঅভ্যুত্থান-পূর্ব রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘পুনর্নির্মিত বয়ান’ সামনে আনার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে দায়মুক্ত বা অপেক্ষাকৃত নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া ছাড়া এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করা যায় না।


বিজ্ঞাপন

গণমাধ্যমে মতপ্রকাশের অধিকার এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ অবশ্যই বহাল থাকা উচিত। প্রশ্নটি মূলত সেখানে—কোন মত কতটা প্রভাবশালীভাবে, কোন প্রেক্ষাপটে এবং কী উদ্দেশ্যে জনপরিসরে জায়গা পাচ্ছে।

‘আগেই বলেছিলাম’ বয়ান ঘিরে অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগ  :  গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বয়ান নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। এনসিপি নেতা সারওয়ার তুষার একটি অনুষ্ঠানে দাবি করেছিলেন, ‘আগেই বলেছিলাম’—এ ধরনের বয়ান প্রচারের জন্য আওয়ামী লীগপন্থী শক্তি অন্তত ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

এই দাবির স্বাধীন কোনো নথিগত প্রমাণ প্রকাশ্যে না এলে এর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তবে অভিযোগটি রাজনৈতিক যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমে ন্যারেটিভ তৈরির সম্ভাব্য সংগঠিত প্রচেষ্টাকে সামনে এনেছে।
এরই মধ্যে আরও একটি দাবি আলোচনায় এসেছে—শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষে ন্যারেটিভ তৈরির উদ্দেশ্যে অন্তত ১০টি মাল্টিমিডিয়া প্ল্যাটফর্ম তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে।

এই দাবিরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। তবে যদি এমন কোনো উদ্যোগ বাস্তবে থেকে থাকে, তাহলে নতুন সরকারের জন্য তা নিছক গণমাধ্যম সম্প্রসারণের বিষয় নয়; বরং মিডিয়া মালিকানা, লাইসেন্স, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—সবকিছুকে ঘিরে একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন।

মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামালকে ঘিরে নতুন অভিযোগ :  এই বিতর্কের সঙ্গে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশের কথিত ভূমিকার অভিযোগও সামনে এসেছে। মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালকে শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ও অনুগত ব্যবসায়ী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, তার মালিকানাধীন ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময় উল্লেখযোগ্য। এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়ে শেখ হাসিনা পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথাও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। তার একটি ইয়ট রয়েছে এবং শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি নিয়মিত অবকাশযাপনে যেতেন—এমন দাবিও করা হচ্ছে। এসব দাবির স্বাধীন প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

তবে নতুন করে যে অভিযোগটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তা হলো—হেফাজতে ইসলাম-সংশ্লিষ্ট মামলার আসামি হিসেবে আলোচিত মোজাম্মেল বাবু, রুপা ও শাকিলদের চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ থাকায় নগদে বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার সঙ্গে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালের নাম জড়ানো হয়েছে।

যদি অভিযোগটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কি রাষ্ট্রীয় আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে এমন আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধা দিতে পারে?

আর যদি সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব সত্যিই আইনগত কারণে স্থগিত বা ফ্রিজ করা হয়ে থাকে, তাহলে নগদে বেতন দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে এবং কোন বিধির আওতায় করা হচ্ছে—সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নিয়েও প্রশ্ন  :  বর্তমান সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। তার ছোট ভাই আশিকের সঙ্গে মোস্তফা কামালের পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে—এমন তথ্যও আলোচনায় এসেছে।

এই সম্পর্কের সূত্র ধরে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী ও মিডিয়া মালিকদের প্রভাব কতটা রয়েছে।

মন্ত্রী হওয়ার আগে বঙ্গভবনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পার্থ গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের চেয়ে গণমাধ্যমের মালিকদের বেশি চেনেন—এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনাটি সত্য হলে সেটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, শুধু ব্যক্তিগত পরিচিতি বা আত্মীয়তার সূত্রকে অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা থাকলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

কারণ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় কেবল একটি প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় নয়। কোন গণমাধ্যম লাইসেন্স পাবে, কার সম্প্রচার কার্যক্রম অনুমোদন পাবে এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্গে এই মন্ত্রণালয় সরাসরি যুক্ত।

নতুন সরকার, পুরোনো মুখ’—কেন এই প্রশ্ন ?
গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাগুলোর একটি ছিল—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে। গণমাধ্যমও তার বাইরে নয়।

কিন্তু অভিযোগ উঠছে, যারা দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক বয়ানকে শক্তিশালী করেছেন, তারাই এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবারও গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া স্পেস পাচ্ছেন।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—গণমাধ্যম কি কেবল ক্ষমতাসীনদের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের অবস্থান বদলাবে, নাকি সাংবাদিকতা ও মতামত তৈরির ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করবে?

আরও বড় প্রশ্ন হলো, গত ১৭ বছরে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও ভিন্নমতের মানুষের প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে, তার কোনো আত্মসমালোচনা বা জবাবদিহি কি থাকবে?

ব্যতিক্রম হিসেবে জোবায়ের বাবু  :  এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিক জোবায়ের বাবুর অবস্থানকে ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থান করলেও দেশের মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

তিনি প্রকাশ্যে ফ্যাসিবাদী রেজিমের কথিত ‘ফুট সোলজারদের’ পুনরুত্থান এবং পুরোনো বয়ানকে গণমাধ্যমে জায়গা দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তার এই অবস্থানকে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। কারণ প্রশ্নটি শুধু আওয়ামী লীগপন্থী বা বিএনপিপন্থী সাংবাদিকের নয়; প্রশ্নটি হলো—একটি গণঅভ্যুত্থানের পর গণমাধ্যম কীভাবে নিজের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করবে।

প্রেস উইং নিয়েও অসন্তোষ  :  সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সেক্রেটারি শফিকের ভূমিকার সঙ্গে বর্তমান সরকারের প্রেস উইংয়ের তুলনাও টানা হচ্ছে।

সমালোচকদের বক্তব্য, নানা বিতর্ক ও সমালোচনা সত্ত্বেও শফিক শেখ হাসিনা আমলের রাজনৈতিক বয়ান প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। বিপরীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংকে একই মাত্রায় সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ উঠেছে।

এই অভিযোগের পেছনে রয়েছে আরেকটি তীব্র ক্ষোভ। যারা শেখ হাসিনা সরকারের সময় দেশে থেকে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তারা মনে করছেন, সেই সময়ের অনেক ‘নিরাপদ দূরত্বে থাকা’ ব্যক্তি এখন নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবস্থান করছেন।

ফলে তাদের প্রশ্ন—যারা সেই দুঃসময়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেননি, তারা আজ রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভ নির্ধারণে কতটা ভূমিকা রাখবেন?
সরকারের জন্য সতর্কবার্তা

গণঅভ্যুত্থানের পর কোনো সরকারই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটতে পারে না। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক শক্তির পক্ষেও সংবাদমাধ্যমে একচেটিয়া বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
বরং প্রয়োজন স্বাধীন, বহুমাত্রিক ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম—যেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এনসিপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে-বিপক্ষে মত প্রকাশের সুযোগ থাকবে; কিন্তু মিথ্যা তথ্য, সংগঠিত অপপ্রচার কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় ন্যারেটিভ তৈরির সুযোগ থাকবে না।

বর্তমান সরকারের জন্য তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে—তারা কি গণমাধ্যমকে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত করবে, নাকি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করবে যেখানে অতীতের ভূমিকা নির্বিশেষে প্রত্যেক সাংবাদিক ও মতামতদাতাকে একই পেশাগত মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হবে ?

কারণ গণঅভ্যুত্থানের পর যদি পুরোনো ক্ষমতার বয়ান নতুন মালিকানা, নতুন প্ল্যাটফর্ম কিংবা নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে আবার ফিরে আসে, তাহলে সেটি শুধু গণমাধ্যমের বিষয় থাকবে না।

এটি হয়ে উঠবে গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
আর সেই কারণেই প্রশ্নটি এখন আরও জোরালো— হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে; কিন্তু সেই সরকারের ন্যারেটিভ কি সত্যিই পরাজিত হয়েছে? নাকি গণমাধ্যমের পর্দার আড়ালে সেটিই আবার নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে?

👁️ 47 News Views

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *