
নিজস্ব প্রতিবেদক : বদলি বাণিজ্য বন্ধে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রেখে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় যে “গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা-২০২৫” জারি করেছিল, বাস্তব প্রয়োগে সেই নীতিমালাই প্রথম বড় পরীক্ষায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদেরও আবার লটারির আওতায় এনে নতুন কর্মস্থল নির্ধারণ করায় প্রকৌশলীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জারিকৃত সরকারি গেজেটে বদলি-পদায়নের জন্য স্পষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করা হলেও, গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত লটারিভিত্তিক বদলির ক্ষেত্রে সেই নীতিমালার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধারা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সুষ্ঠু মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বদলি বাণিজ্য বন্ধের উদ্দেশ্যে প্রথমবারের মতো লটারির মাধ্যমে ৭৬৭ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একটি বড় অংশের দাবি, স্বচ্ছতার নামে এমন একটি ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যা আইনসম্মত নীতিমালাকেই কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছে।

গেজেট অনুযায়ী, একই কর্মস্থলে সাধারণভাবে দুই বছর পূর্ণ না হলে বদলি করা হবে না এবং তিন বছরের বেশি রাখা যাবে না। একই সঙ্গে কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠতা, সততা, কর্মদক্ষতা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), বিশেষ কারিগরি দক্ষতা ও মানবিক বিষয় বিবেচনার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

কিন্তু লটারিভিত্তিক বদলিতে এসব মূল্যায়নের পরিবর্তে একই প্রক্রিয়ায় সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এক বছরও পূর্ণ হয়নি—এমন কর্মকর্তাদেরও বদলি করা হয়েছে। এমনকি মাত্র এক মাস আগে বদলি হয়ে যোগদান করা কর্মকর্তারাও নতুন করে বদলির তালিকায় স্থান পেয়েছেন।নীতিমালার ৭, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর ধারায় সরকারি চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রীর একই বা নিকটবর্তী কর্মস্থলে পদায়ন, গুরুতর অসুস্থতা, পারিবারিক সংকট, চিকিৎসাধীন পরিবারের সদস্য এবং অবসর-পূর্ব আবেদনের মতো মানবিক বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, লটারির সময় এসব বিষয় প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়েছে।
ফলে এমন অনেক কর্মকর্তা দূরবর্তী জেলায় বদলি হয়েছেন, যাদের পরিবারের সদস্য ক্যানসারসহ জটিল রোগে চিকিৎসাধীন। আবার অনেক সরকারি চাকরিজীবী দম্পতি আলাদা জেলায় ছিটকে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আরও একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে। নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের কথা বলা হলেও, অভিযোগ রয়েছে—২০২২ সালে যোগ দেওয়া অপেক্ষাকৃত নবীন কর্মকর্তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে।
প্রকৌশলীদের আশঙ্কা, অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকলে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন, উন্নয়ন কাজের তদারকি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, লটারি স্বচ্ছতার একটি উপায় হতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কখনোই সম্পূর্ণ ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না। কারণ সরকারি নীতিমালায় স্পষ্টভাবে দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে পদায়নের কথা বলা হয়েছে। সেখানে লটারি যদি একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে নীতিমালার মৌলিক দর্শনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এদিকে একযোগে ৭৬৭ কর্মকর্তার বদলিতে সরকারের বিপুল আর্থিক ব্যয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী বদলিকৃত কর্মকর্তাদের টিএ-ডিএ, পরিবহন ও অন্যান্য ভাতা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, এতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।
প্রশ্ন উঠেছে, ব্যয় সংকোচনের সময়ে এত বড় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের যৌক্তিকতা কতটা ছিল। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বদলি বাণিজ্য বন্ধের উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজন ছিল; কিন্তু সেই উদ্যোগ যদি মন্ত্রণালয়ের নিজের জারি করা নীতিমালাকেই উপেক্ষা করে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সেটি ভবিষ্যতে আরও বড় প্রশাসনিক জটিলতার কারণ হতে পারে।
নীতিমালার ২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো অস্পষ্টতা দেখা দিলে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও সেটি প্রকাশিত নীতিমালার মৌলিক বিধান লঙ্ঘনের সুযোগ সৃষ্টি করে না।
এ পরিস্থিতিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক শীর্ষ পর্যায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বদলি বাণিজ্য রোধের নামে গ্রহণ করা এই উদ্যোগে যদি প্রকাশিত সরকারি নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে নীতিমালা কি শুধুই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি বাস্তব প্রয়োগে ইচ্ছাকৃতভাবে তা উপেক্ষা করা হয়েছে—এমন প্রশ্ন এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতর-বাইরে সমানভাবে আলোচিত হচ্ছে।
সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, এখন প্রয়োজন লটারিভিত্তিক বদলি প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা, নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই এবং যেসব ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর স্বাধীন প্রশাসনিক মূল্যায়ন। কারণ স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ যদি নিজেই স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তবে সেই উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য।
