
নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকারি দপ্তরে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে ‘জুন ক্লোজিং’-এর পর বড় ধরনের প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা থাকলেও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের একাংশের সেই প্রত্যাশা এবারও পূরণ হয়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে। তাদের প্রশ্ন, অর্থবছর শেষ হওয়ার পরও যদি একই ব্যক্তিরা বছরের পর বছর ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বহাল থাকেন, তাহলে বদলি-পদায়নের নীতিই বা কার জন্য ?

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কাঙ্ক্ষিত বদলি বা পদায়নের জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেক সময় ‘জুন ক্লোজিং’ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। কিন্তু জুন পেরিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু হলেও তাদের অনেকের বদলি হয় না। বিপরীতে কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থেকে প্রশাসনিক ও প্রকল্প-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়—মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রশ্ন, বদলি-পদায়নে যদি স্বচ্ছ ও অভিন্ন নীতি থাকে, তাহলে দীর্ঘদিন একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ কোথায় ?
মাসুদ রানাকে ঘিরে প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকার রহস্য কী ? এই আলোচনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানার নাম সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর আগে শেরেবাংলা নগর-৩ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও কয়েক বছর ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রের সদস্য প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সুবিধা পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে নিজের একটি প্রভাববলয় তৈরি করে সেই অবস্থান ধরে রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন
কারণ, একজন কর্মকর্তার দীর্ঘদিন কোনো পদে থাকা নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। প্রশ্নটি হলো—তার দায়িত্বকাল, বদলি-পদায়নের নথি এবং একই সময়ে অন্য কর্মকর্তাদের বদলির সঙ্গে তুলনা করলে কোনো ব্যতিক্রমী সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কি না।
শত শত কোটি টাকার প্রকল্প, দরপত্রেও নজর : গণপূর্তের কয়েকজন প্রকৌশলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ডিভিশন-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মাসুদ রানা বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের মুগদা মেডিকেল কলেজ প্রকল্প, প্রায় ৭৫ কোটি টাকার বিএম ভবন এবং একাধিক থানা কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় তার অধীনস্থ দপ্তরের ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তার আওতাধীন প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ ছোট ছোট প্যাকেজে দরপত্র দেওয়ার বিষয়েও কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন।
অভিযোগকারীদের যুক্তি, একই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলে প্রকল্প, দরপত্র, ঠিকাদার ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বলয় গড়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়। সেই ঝুঁকি এড়াতেই সরকারি চাকরিতে বদলি-পদায়নের নীতি গুরুত্বপূর্ণ।
পাবনায় রাশেদ কবিরকে ঘিরেও অভিযোগের স্তূপ : গণপূর্তের পাবনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবিরকে ঘিরেও বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ধানমন্ডি গণপূর্ত উপবিভাগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় এবং পরবর্তীতে পাবনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হওয়ার পর বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় শত কোটি টাকার বেশি মূল্যের কথিত ভুয়া বিলের একটি ঘটনায়ও তার নাম আলোচনায় এসেছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। ওই সময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম ফারুক চৌধুরী বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
বর্তমানে পাবনা গণপূর্ত বিভাগে প্রভাবশালী অবস্থানে থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে রাশেদ কবিরের বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, প্রকল্পের হিসাব, দরপত্র এবং সরকারি তদন্তের ফলাফল যাচাই করা অপরিহার্য।
সাময়িক বরখাস্ত কর্মকর্তার বকেয়া প্রায় ১৯ লাখ টাকা—প্রশ্নের কেন্দ্রে কে ? নথির বরাত দিয়ে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সাময়িক বরখাস্ত থাকা এক উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে প্রায় ১৯ লাখ টাকা বকেয়া বেতন-ভাতা দেওয়ার ঘটনায় রাশেদ কবিরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, অসদাচরণের অভিযোগে দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তাদের একজনের আবেদন সুপারিশসহ হিসাব কার্যালয়ে পাঠানোর পর প্রায় ১৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর ওই অর্থ ফেরতের বিষয়টি সামনে আসে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
এখানেই উঠছে গুরুতর প্রশাসনিক প্রশ্ন—যে অর্থ পরিশোধের বৈধতা নিয়ে পরবর্তীতে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেই অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব কতটা ছিল?
জুনের শেষ সময়ে বিল পরিশোধ: কাজ শেষ হওয়ার আগেই টাকা ? পাবনা গণপূর্ত বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ সময়ে, বিশেষ করে জুন মাসে, কয়েকটি বড় অঙ্কের বিল পরিশোধ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের দরপত্র পদ্ধতি নিয়েও আপত্তি রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে লিমিটেড টেন্ডারিং মেথডের (এলটিএম) পরিবর্তে ওপেন টেন্ডারিং মেথড (ওটিএম) ব্যবহার করা হয়েছে। এতে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
প্রশ্ন হচ্ছে—সরকারি অর্থবছরের শেষ সময়ে দ্রুত বিল পরিশোধের নামে কাজের বাস্তব অগ্রগতি, পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার ও কার্যাদেশ যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না।
রূপপুর গ্রিনসিটি ও মেডিকেল কলেজ প্রকল্পেও অভিযোগ : রূপপুর গ্রিনসিটি এবং পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল ও অবকাঠামোগত কাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোথাও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, কোথাও অনুমোদিত সিডিউলের বাইরে কাজ এবং রক্ষণাবেক্ষণের নামে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। কিছু ভবনের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মেরামত দেখিয়ে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই যাচাই করতে হবে কার্যাদেশ, অনুমোদিত সিডিউল, পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, দরপত্রের নথি এবং প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে হিসাব মিলিয়ে।
বদলি-পদায়ন কি তবে সবার জন্য সমান নয় ? গণপূর্তের এই অভিযোগগুলো নতুন করে সামনে এনেছে পুরোনো একটি প্রশ্ন—সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি কি প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী হয়, নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাব ও যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে ?
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষোভের জায়গাটি স্পষ্ট—একদিকে তাদের বলা হয় ‘জুন ক্লোজিং’-এর পর বদলি হবে; অন্যদিকে জুন শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিনের ‘গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারের’ অনেক মালিকের চেয়ার নড়ছে না।

মন্ত্রণালয়ের নীরবতা কি প্রশ্ন আরও বাড়াচ্ছে ? এই পরিস্থিতিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দায়িত্ব নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে তার কর্মকাল, বদলি ইতিহাস, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে কি না—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কেউ অভিযোগ করলেই তিনি অপরাধী নন। কিন্তু অভিযোগ উঠলে সেটি তদন্ত না করাও কোনো সমাধান নয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে যদি সত্যিই দীর্ঘদিন একই কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার মাধ্যমে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেটি ভাঙার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরেরই। আর অভিযোগ যদি ভিত্তিহীন হয়, তাহলেও নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, মন্ত্রণালয় চাইলে কয়েকটি বিষয় খুব সহজেই যাচাই করতে পারে—কে কত বছর ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, কার বদলি কতবার স্থগিত হয়েছে, কার দায়িত্বকালে কোন কোন বড় প্রকল্পের দরপত্র হয়েছে, জুন ক্লোজিংয়ের শেষ সময়ে কোন কোন বিল ছাড় হয়েছে এবং সেই বিলের বিপরীতে বাস্তবে কতটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছিল।
অতএব প্রশ্নটি এখন শুধু ‘বদলি হবে কি না’—এমন নয়। প্রশ্ন হলো, সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি-পদায়নের নীতি কি সত্যিই সবার জন্য সমান? নাকি কিছু কর্মকর্তা প্রশাসনিক নিয়মের আড়ালে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার আঁকড়ে থাকার বিশেষ সুযোগ পাচ্ছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে দরকার রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, নথি প্রকাশ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নিরপেক্ষ তদন্ত। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ মিথ্যা হলে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদেরও যথাযথভাবে দায়মুক্ত করতে হবে। এর মাঝামাঝি কোনো অস্পষ্ট অবস্থান জনমনে সন্দেহই বাড়াবে। জুন ক্লোজিং শেষ হয়েছে। এখন দেখার বিষয়—গণপূর্তে শুধু অর্থবছর বদলায়, নাকি সত্যিই বদলায় ‘চেয়ার’ও।
