
গণপূর্ত অধিদপ্তরের “পেকু ” ফিরোজ।নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) কাজী মো. ফিরোজ হাসানের দীর্ঘ চাকরিজীবন ঘিরে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন।

সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রায় ২৮ বছরের চাকরিজীবনে তিনি দীর্ঘ সময় ঢাকায় এবং একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রকিউরমেন্ট এস্টেট ও কনস্ট্রাকশন ইউনিট—পেকুতে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নে অন্তত ১৭টি দেশে ২৫টির মতো বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে অবস্থান এবং একের পর এক বিদেশ সফরের বিষয়টি নিয়ে সহকর্মীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের প্রশ্ন—একজন কর্মকর্তার দীর্ঘ সময় একই ক্রয়সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে অবস্থানের প্রশাসনিক যৌক্তিকতা কী এবং সরকারি অর্থে বিদেশ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নির্বাচন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল?

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কাজী মো. ফিরোজ হাসান আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছেন, তিনি এতগুলো প্রশিক্ষণে যাননি; এমনকি তার চেয়েও বেশি বিদেশ সফর করেছেন এমন কর্মকর্তাও গণপূর্তে রয়েছেন।

চাকরির প্রায় পুরো সময় ঢাকায় : গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাওয়া পোস্টিং ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কাজী ফিরোজ হাসান ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ স্টাফ অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। মাত্র দেড় মাসের মাথায় ১৬ মার্চ তাকে সাভার গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হয়।
২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ঢাকার পিপিসি বিভাগে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন।

এরপর একই বিভাগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০০৯ সালের নভেম্বরে মাত্র প্রায় এক মাসের জন্য নেত্রকোনা গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৪ ডিসেম্বর ২০০৯-এ ফের ঢাকার পেকু বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। সেখানেই শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের নতুন অধ্যায়। নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী, এরপর ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পেকু সার্কেলে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন ও সমন্বয়) হিসেবেও দায়িত্ব পান। অর্থাৎ ২০০৯ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর এবং আগের পিপিসি-পেকু সংশ্লিষ্ট দায়িত্বসহ প্রায় ১৭ বছর ধরে একই ক্রয় ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কাজী ফিরোজ হাসান।
গণপূর্তে দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে অবস্থানের কারণেই সহকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘পেকু ফিরোজ’ নামে।
পেকু—যে ইউনিটের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত : গণপূর্ত অধিদপ্তরের পেকু বিভাগ মূলত ক্রয়সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই ইউনিটে একই কর্মকর্তার অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বদলি নীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সহকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার ফলে ওই কর্মকর্তার প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ক্রমে বেড়েছে।
তবে কাজী ফিরোজ হাসান ঢাকায় দীর্ঘদিন অবস্থানের ব্যাখ্যায় বলেছেন, তিনি মূলত বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে ছিলেন এবং নিয়মিত ‘ওয়ার্কিং’ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের এসব কাজ ছিল ‘নন-প্রফিটেবল’।
বিদেশ সফরের দীর্ঘ তালিকা : চাকরির নথিতে থাকা প্রশিক্ষণ ও সফরের তথ্য আরও একটি আলোচিত চিত্র সামনে আনে। ২০০৯ সালের জুনে মালয়েশিয়ায় ‘ফ্যাসিলিটি মডার্নাইজেশন’ শীর্ষক ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিদেশ সফরের এই অধ্যায়।
সরকারি অর্থায়নে ১৪ থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত তিনি মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণে অংশ নেন। এরপর একে একে তার প্রশিক্ষণ ও সরকারি সফরের তালিকায় যুক্ত হয়েছে— জাপান, মিসর, ইতালি, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া, স্পেন, ভারত, তুরস্ক, বেলজিয়াম, গ্রিস, ফিনল্যান্ড ও বুলগেরিয়া।
নথি অনুযায়ী, মালয়েশিয়াসহ মোট ১৭টি দেশে বিভিন্ন সময়ে সরকারি অর্থায়নে প্রশিক্ষণ বা সফরে অংশ নেওয়ার তথ্য রয়েছে। ২০১২ সালে জাপানে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ; ২০১৫ সালে মিসরে মেরিন টেকনোলজি, ইতালিতে ভোকেশনাল এডুকেশন; একই বছর ডেনমার্কে অকুপেশনাল সেফটি; ২০১৬ সালে সিঙ্গাপুরে লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট; ২০১৭ সালে নেদারল্যান্ডসে মেরিন টেকনোলজি; ২০১৮ সালে রাশিয়ায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সফর—তালিকাটি সেখানেই থেমে থাকেনি।
২০১৯ সালে স্পেনে সেফটি ডিভাইস কোয়ালিটি, ভারতে রবীন্দ্রনাথ গ্যালারি, তুরস্কে ‘Panorama 1453’ এবং বেলজিয়ামে জেনোসাইড মিউজিয়াম; ২০২১ সালে গ্রিসে সেন্টেনিয়াল স্কুল; ২০২২ সালে ফিনল্যান্ডে লিফট পারফরম্যান্স এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে বুলগেরিয়ায় ওয়াটার ফাউন্টেন বিষয়ক সফরের তথ্যও নথিতে রয়েছে। নথিতে রাশিয়া সফরের ক্ষেত্রে সময়কাল ১৯ জুন ২০১৮ থেকে ২৫ জুন ২০২৮ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ তারিখ হওয়ায় নথির তথ্যটিতে অসঙ্গতি রয়েছে—এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের দাবি রাখে।
যুক্তরাষ্ট্র সফরও ছিল, শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি সেন্ট্রাল এসি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল কাজী ফিরোজ হাসানের। তিনি জানিয়েছেন, বিমানবন্দরে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত সেই সফরে যেতে পারেননি।
বিদেশ সফরের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কাজী ফিরোজ হাসান বলেন, তিনি আসলে এতগুলো প্রশিক্ষণে যাননি এবং সংখ্যা আরও কম হবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, গণপূর্তে তার চেয়েও বেশি প্রশিক্ষণে যাওয়া কর্মকর্তাও রয়েছেন।
এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সরকারি নথিতে থাকা সফরগুলোর পূর্ণাঙ্গ হিসাব, ব্যয়, মনোনয়ন প্রক্রিয়া এবং প্রশিক্ষণের ফলাফল কি কখনো সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে ?
‘ওয়ার্কিং বিভাগে অদক্ষতা’র অভিযোগ : কাজী ফিরোজ হাসানের সহকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিন মূল ‘ওয়ার্কিং’ বিভাগে দায়িত্ব পালন না করায় মাঠপর্যায়ের প্রকৌশল ও বাস্তব নির্মাণকাজের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাদের অভিযোগ, নিজের অদক্ষতা আড়াল করতে তিনি বিভিন্ন সময় ওয়ার্কিং বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঢালাও দুর্নীতির অভিযোগ তুলতেন।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ : ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কাজী ফিরোজ হাসান একটি রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
একই সঙ্গে সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্তের কর্মকর্তাদের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য বা ‘আমলনামা’ গোপনে সংশ্লিষ্ট মহলে পৌঁছে দেওয়া হতো। পরে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। এমনকি কর্মকর্তাদের পদায়নে লটারির পদ্ধতি চালুর পেছনেও তার ভূমিকা ছিল—এমন অভিযোগও রয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির : একজন প্রকৌশলী কত দেশে সরকারি প্রশিক্ষণে যাবেন—এটি নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
কিন্তু যখন একই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ক্রয়সংক্রান্ত ইউনিটে অবস্থান : চাকরিজীবনের প্রায় পুরোটা সময় ঢাকায় থাকা, একাধিক দেশে ধারাবাহিক সরকারি সফর এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ একসঙ্গে সামনে আসে, তখন বিষয়গুলো নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে ।
এখন প্রশ্ন হলো—কাজী ফিরোজ হাসানের বিদেশ সফরের প্রতিটি ক্ষেত্রে মনোনয়ন কীভাবে হয়েছে ? কারা তাকে মনোনীত করেছে ? সফরগুলোর মোট সরকারি ব্যয় কত ? প্রশিক্ষণ শেষে তার অর্জিত জ্ঞান কীভাবে প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে ? একই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন পেকুতে থাকার প্রশাসনিক অনুমোদনগুলো কীভাবে দেওয়া হয়েছে ? আর বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তার কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ছিল কি না ? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কেবল নথিনির্ভর, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন প্রশাসনিক যাচাইয়ে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে যতই দক্ষ বা সৎ হওয়ার দাবি করুন না কেন, দীর্ঘমেয়াদি পদায়ন, সরকারি অর্থে বিদেশ সফর এবং প্রশাসনিক প্রভাব—এই তিনটি বিষয়ে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই।
