
নিজস্ব প্রতিবেদক : বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমকে ঘিরে উঠেছে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কর্মজীবনে যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই তিনি প্রভাববলয় তৈরি করে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সিন্ডিকেট। এ কারণেই সংশ্লিষ্ট মহলে তাকে অনেকে ‘কাস্টমস মাফিয়া’ নামে অভিহিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এও তার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেনের ছত্রছায়ায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও কমিশনারের স্টাফ অফিসার গোলাম মোহাম্মদ হাসনাইন, কমিশনারের পিএ মজনু মিয়াসহ কয়েকজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও সিপাহিকে নিয়ে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও প্রামাণ্য যাচাই প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যথাযথভাবে যুক্ত করা হবে।
পদায়ন ঘিরে প্রশ্ন : সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট থেকে বদলি হয়ে বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এ আসার পর জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে তদবিরের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ‘হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তা’র পদটি বাগিয়ে নেন বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম।

অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই পদে বসে তিনি বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল আটকে রাখা, অডিট প্রক্রিয়া শিথিল করা, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বন্ড লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি বা নিরসনের নামে আর্থিক সমঝোতার পথ তৈরি করেছেন। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত অবৈধ মাসোহারা আদায় করা হচ্ছে। এই অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির বিষয় নয়—রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও বন্ড সুবিধার ওপরও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে।

‘কোটি টাকার মাসোহারা’, কোথায় যাচ্ছে অর্থ ?
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বন্ড কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, ফাইল নিষ্পত্তি, অডিট, শোকজ এবং লাইসেন্সসংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের চাপ তৈরি করা হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ০৮.০১.০০০০.০০১১.০৫.০০৪.২০২০-৬৪১, তারিখ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর আলোকে তার দায়িত্ব ও কার্যক্রমের নথিপত্র পর্যালোচনা করলেই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্ত্রীর নামে রাজধানীতে বিপুল সম্পত্তি ? বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের সম্পদ নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, তার স্ত্রী সানজিদা আফরিন লিপির নামে রাজধানীর ভাটারা মৌজায় বিপুল পরিমাণ ভূ-সম্পত্তি রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গৃহিণী হিসেবে দৃশ্যমান কোনো স্বতন্ত্র আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও তার নামে এসব সম্পত্তি কীভাবে অর্জিত হয়েছে, সেটি তদন্তের বিষয়।
প্রাপ্ত তথ্যে বলা হয়েছে, ভাটারা মৌজার জেএল নং-১৫, নামজারি খতিয়ান নং-২৯৭১৬, দাগ নং-২০৭৬৩-সংক্রান্ত সম্পত্তি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭৫৬(IX-I) নম্বর নামজারি মামলার মাধ্যমে সানজিদা আফরিন লিপির নামে কেনা হয়। তিনি খুলনার সোনাডাঙ্গার স্থায়ী বাসিন্দা বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।জমির পরিমাণ নিয়ে ভয়াবহ গড়মিল : সম্পত্তির পরিমাণ নিয়েও অভিযোগে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর অসঙ্গতি।
অভিযোগ অনুযায়ী— মূল নামজারি খতিয়ানে জমির পরিমাণ ০.৪০০০ একর, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ বা ২৪ কাঠা। অপরদিকে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডে একই সম্পত্তির পরিমাণ ৪.৯৬ একর, যা প্রায় ৩০০ কাঠার সমপরিমাণ।একই সম্পত্তির ক্ষেত্রে সরকারি নথিতে এত বড় পার্থক্য কীভাবে তৈরি হলো—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ভূমি অফিসের মূল দলিল, নামজারি নথি, খতিয়ান, দলিল রেজিস্ট্রি এবং ডিজিটাল রেকর্ড।
পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ভাটারা এলাকায় কাঠাপ্রতি জমির বর্তমান বাজারদর ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ধরে ৪০ শতাংশ জমির মূল্য আনুমানিক ১৫ থেকে ৩৬ কোটি টাকা হতে পারে। আর ডিজিটাল রেকর্ডে উল্লেখিত ৪.৯৬ একর জমির মূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে বলে তাদের দাবি। তবে জমির প্রকৃত মালিকানা, পরিমাণ ও বাজারমূল্য ভূমি রেকর্ড, রেজিস্ট্রি দলিল এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
শুধু রাজধানীর ভাটারা নয়, সম্পদের বিস্তৃতি খুলনাতেও ?
অভিযোগ রয়েছে, স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজনের নামে রাজধানীর পাশাপাশি খুলনার সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকাতেও সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর নথির সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা ও তার পরিবারের নামে দৃশ্যমান আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ পাওয়া গেলে সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক লেনদেন, দলিল এবং অর্থের উৎস পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
রাজস্ব ব্যবস্থায় কতটা ক্ষতি? কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবস্থার আওতায় ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট শর্তে শুল্ক-কর সুবিধা পেয়ে থাকেন। ফলে বন্ড সংক্রান্ত ফাইল, লাইসেন্স, অডিট ও নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হলে তার প্রভাব ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রীয় রাজস্ব—উভয়ের ওপরই পড়তে পারে।
একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, হেডকোয়ার্টার রাজস্ব কর্মকর্তার পদটি পুরো কমিশনারেটের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই পর্যায়ে কোনো সংঘবদ্ধ অনিয়ম হলে তা ব্যক্তিগত দুর্নীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির রূপ নিতে পারে।
বদলির গুঞ্জন, নাকি ‘সেফ এক্সিট’ ? এদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমকে বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর) থেকে অন্যত্র বদলি করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে আলোচনা রয়েছে। আবার অভিযোগকারীদের একটি অংশের দাবি, বিষয়টি সামনে আসার আগেই তিনি নিজেই অন্যত্র বদলির জন্য তদবির করছেন। তবে বদলি-সংক্রান্ত এই দাবিরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
দুদকের তদন্তের দাবি : অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম ও তার পরিবারের সম্পদ এবং দায়িত্ব পালনকালে তার আর্থিক কার্যক্রম তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অভিযোগকারীরা।
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বৈধ উৎস যাচাই। ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসসংক্রান্ত ফাইল, লেনদেন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নথি অডিট করা। তার স্বাক্ষরিত ফাইল নোটিং ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা করা। সংশ্লিষ্ট বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য গ্রহণ করা। অভিযোগে উল্লিখিত সম্পত্তির দলিল, নামজারি ও ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড যাচাই করা।এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন ও যোগাযোগের আইনসম্মত তদন্ত করা।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা : একজন সরকারি রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিছক কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ অভিযোগগুলো সত্য হলে এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব, বন্ড সুবিধা, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং সরকারি প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন সরাসরি জড়িত।
তাই অভিযোগকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত নথিপত্রের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত করা। একই সঙ্গে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম, অতিরিক্ত কমিশনার দেলোয়ার হোসেন, গোলাম মোহাম্মদ হাসনাইন, মজনু মিয়া এবং অভিযোগে নাম আসা অন্যদের বক্তব্যও গ্রহণ করা জরুরি।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার মাসোহারা, সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং পরিবারের নামে বিপুল সম্পদ অর্জনের মতো অভিযোগ ওঠার পর নীরবতা নয়—স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তই এখন সবচেয়ে জরুরি।
