
নিজস্ব প্রতিবেদক : নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম, এনবিপি, এনপিপি, এনডিইউ, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এমফিল, পিএইচডি পদোন্নতি পেয়ে এডমিরাল হয়েছেন। বর্ণাঢ্য সামরিক ক্যারিয়ারে নানা গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড, স্টাফ ও নেতৃত্বমূলক দায়িত্ব পালনের পর এবার দেশের নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ পদমর্যাদার র্যাংকে উন্নীত হলেন তিনি।

রোববার (২৩ আগস্ট) বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে এক আনুষ্ঠানিক আয়োজনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নৌবাহিনী প্রধানকে এডমিরাল র্যাংক পরিয়ে দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনী প্রধানকে অভিনন্দন জানান।
র্যাংক ব্যাজ পরিধান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি; বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন; সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান; প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আশরাফ উদ্দিনসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম গত ২৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

মেধা ও যোগ্যতায় উজ্জ্বল সামরিক ক্যারিয়ার : এডমিরাল আজীম ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। রয়্যাল মালয়েশিয়ান নৌবাহিনী থেকে বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে নৌ-প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই এক্সিকিউটিভ ব্রাঞ্চে কমিশন লাভ করেন। ৮৭-এ ব্যাচে জ্যেষ্ঠতা ও মেধায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন।

বিজ্ঞাপন
শিক্ষাজীবনেও তাঁর সাফল্যের ধারাবাহিকতা ছিল উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে তিনি মেরিটাইম গভর্ন্যান্স বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এমফিল ডিগ্রির পাশাপাশি স্ট্র্যাটেজিক, ডিফেন্স ও অপারেশনাল স্টাডিজ বিষয়ে দেশ-বিদেশ থেকে প্রথম শ্রেণিসহ তিনটি মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
এডমিরাল আজীম ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি), আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স (এএফডব্লিউসি) এবং ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ (ডিএসসিএসসি)-এর কৃতী গ্র্যাজুয়েট। ছাত্রজীবনে এসএসসি ও এইচএসসি—উভয় পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্থান লাভ করায় তিনি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেন।

যুদ্ধজাহাজের কমান্ড থেকে নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে : প্রায় চার দশকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে এডমিরাল আজীম বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড, স্টাফ ও নেতৃত্বমূলক দায়িত্ব দক্ষতা ও সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন।
তিনি কমান্ডার চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চল (কমচিট), কমান্ডার ঢাকা নৌ অঞ্চল (কমঢাকা), কমান্ডার সাবমেরিন (কমসাব), কমান্ড্যান্ট বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি (বিএনএ) এবং নৌবাহিনী সদর দপ্তরের পরিচালক নৌ-অপারেশন্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ফ্রিগেট বানৌজা ওমর ফারুক, বানৌজা এস আর আমিন, বানৌজা নির্ভয়, বানৌজা সৈকতসহ প্রায় সব ধরনের যুদ্ধজাহাজের অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। পাশাপাশি বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি, ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
জাতিসংঘ মিশন থেকে কূটনৈতিক দায়িত্ব : সামরিক দায়িত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এডমিরাল আজীমের রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তিনি লেবানন ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেন।
সর্বশেষ তিনি ওমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে বাংলাদেশ-ওমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
অর্জনের ঝুলিতে একাধিক পদক ও সম্মাননা : দীর্ঘ কর্মজীবনে পেশাগত দক্ষতা ও সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে এডমিরাল আজীম বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ শান্তিকালীন পদক ‘নৌবাহিনী পদক’ (এনবিপি), ‘নৌ পারদর্শিতা পদক’ (এনপিপি), ‘জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কার’ এবং ‘জাতীয় স্কাউট পুরস্কার’ (রৌপ্য ইলিশ পদক) অর্জন করেন।
এ ছাড়া তিনি তিনবার নৌবাহিনী প্রধানের প্রশংসাসূচক ইনসিগনিয়া লাভ করেন। তাঁর অর্জনের তালিকায় রয়েছে ‘বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন’ পুরস্কার, ‘সেরা ব্যক্তিগত গবেষণাপত্র পুরস্কার’ এবং অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার বিশেষায়িত প্রশিক্ষণে ‘সেরা শিক্ষার্থী পুরস্কার’।
গবেষণা ও লেখালেখিতেও সক্রিয় : পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি এডমিরাল আজীম একজন মননশীল পাঠক, লেখক ও গবেষক। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং সামরিক ও নৌ-কৌশলগত বিষয়ে বিভিন্ন সমাদৃত জার্নাল ও সাময়িকীতে তাঁর একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
খেলাধুলার মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহের তালিকায় রয়েছে গলফ, বাস্কেটবল, দাবা ও টেবিল টেনিস। তিনি বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় সাবলীল এবং মালে ও ফরাসি ভাষায় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম বেগম নুরতাজ আজীমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তাঁরা দুই কন্যাসন্তানের জনক-জননী।
দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা, উচ্চতর একাডেমিক যো গ্যতা, দেশ-বিদেশে নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং নৌ-কৌশলগত দক্ষতার সমন্বয়ে এডমিরাল পদে তাঁর পদোন্নতি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নেতৃত্বের ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। (তথ্য সুত্র ও ছবি : আই এস.পি.আর)
